ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

সাফল্য

হাওরপাড়ের স্বপ্নবিজয়ী

হাওরপাড়ের স্বপ্নবিজয়ী

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

বাবা ক্ষৌরকর্ম করেন। মা গৃহিণী। বড় ভাই একটি উন্নয়ন সংগঠনের মাঠকর্মী। বাবা ও ভাইয়ের কষ্টার্জিত টাকা ও নিজের টিউশনির টাকায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসন বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরির জন্য উৎকণ্ঠায় ছিলেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার হাওরপাড়ের গ্রাম গলহার তপন সরকার রাজ। ৩৮তম বিসিএসের ফলাফল রাজ এবং তার পরিবারের সেই দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছে। পুলিশ ক্যাডারে (সহকারী পুলিশ সুপার) চাকরি হয়েছে তার।
রাজের বাবা গোপাল সরকার ও শান্তি সরকার আনন্দে উদ্বেলিত। গোপাল সরকার বলেন, 'আমি একেবারেই দরিদ্র মানুষ। ছেলেটি তার নিজের চেষ্টায়ই এটুক পর্যন্ত এসেছে। লোকে বলে, আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে!'
কেবল তপন সরকার রাজ নয়। হাওরের আরও অনেক তারকা শিক্ষা সংগ্রামীরা ৩৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। হাওরপাড়ের মধ্যনগর বাজারের কৃষক মতিউর রহমান এবং গৃহিণী বেগম রোকেয়ার ছেলে মো. সায়িদুল ইসলাম সায়িদেরও প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি হয়েছে। সায়িদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম সায়িদ আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যেই বড় হয়েছেন।
পুলিশ ক্যাডারে (সহকারী পুলিশ সুপার) চাকরি হয়েছে সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়ার মানবেন্দ্র সরকারের। তার বাবা মুকুল কান্তি সরকার সুনামগঞ্জ কালেক্টরেটের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, মা গৃহিণী। মানবেন্দ্র শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ অনার্স সম্পন্ন করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মুকুল কান্তি সরকার বলেন, 'আমার দুই ছেলের এক ছেলে এমবিবিএস পাস করে এখন ইন্টার্নি চিকিৎসক। বড় মেয়ে ৩৬তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে কৃষি ক্যাডারে চাকরি হয়েছে। ছোট মেয়ে মনিকা সরকার সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। এরা সবাই নিজের পড়াশোনার খরচের টাকা নিজেরাই টিউশনি করে উপার্জন করেছে। তাদের উপার্জনের টাকায় সংসার খরচও হয়েছে।'
একইভাবে মধ্যনগরের ঘাষি গ্রামের ডলি রানী সরকারও সংগ্রামী তারকা শিক্ষার্থীদের আরেকজন। ডলির কৃষক বাবা রাজকুমার সরকার মন্টু ও গৃহিণী মা সুনীতি রানী সরকারের জন্য ৬ মেয়ে ও এক ছেলের খাবার জোগান দেওয়াই ছিল কষ্টের।
ডলিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা অবস্থায়ই টিউশনি করতে হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার বছরেও ৫-৬টি টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারের খরচও চালাতে অর্থ পাঠাতে হয়েছে এই শিক্ষা সংগ্রামীকে। চার মাস আগে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রতন কুমার পালের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ডলির।
শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হওয়া আরেক শিক্ষা সংগ্রামী রাজিব তালুকদারও চাকরি ও টিউশনি করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে চাকরিরত এই শিক্ষা সংগ্রামী জানালেন, তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক রাসেন্দ্র তালুকদার ও মা সন্ধ্যা রানী তালুকদার ধর্মপাশা উপজেলার ঢুলপসির গ্রামের বাড়িতেই থাকেন।
এ ছাড়া হাওরপাড়ের জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক বিবেকানন্দ তালুকদার ও আভা রানী তালুকদারের ছেলে প্রকৌশলী অনিন্দ অভির সড়ক ও জনপথ বিভাগে এবং একই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষক রেজাউল আম্বিয়া ও স্কুলশিক্ষিকা হামিদা খাতুনের মেয়ে সুলতানা নাসরিন সুমির চাকরি হয়েছে শিক্ষা ক্যাডারে।
বিসিএস উত্তীর্ণ এসব শিক্ষার্থী হাওরপাড়ের স্বপ্নবিজয়ী শিক্ষা সংগ্রামী।

আরও পড়ুন

×