ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ লাখ টন পণ্যের জট

চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ লাখ টন পণ্যের জট

ফাইল ছবি

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২১ | ১৪:২৭

স্মরণকালের ভয়াবহ পণ্যজটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। জেটিতে ২০ ফুট দীর্ঘ ৪৯ হাজার কনটেইনার রাখার ধারণ ক্ষমতা আছে। গতকাল সোমবার কনটেইনার ছিল প্রায় ৪২ হাজার। এসব কনটেইনারের মধ্যে প্রায় ৪১ হাজারই ছিল পণ্যভর্তি। এগুলোতে পণ্য ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টন। বহির্নোঙ্গরে থাকা ২০টি কনটেইনার জাহাজে আছে আরও প্রায় তিন লাখ টন পণ্য। বন্দর জেটিতে থাকা ৯টি জাহাজে আছে প্রায় ২০ হাজার টন পণ্যবোঝাই কনটেইনার। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এখন জট লেগেছে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্যের। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার আমদানি কনটেইনার নামছে বন্দর জেটিতে। কিন্তু ঈদের পরদিন থেকে রোববার রাত পর্যন্ত তিন দিনে সরাসরি বন্দর থেকে মাত্র ৩২৫টি আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার খালাস করেছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল সোমবার খালাস হয়েছে ২ হাজার ১৯টি কনটেইনার। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪ হাজার কনটেইনার খালাস হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি ডিপোতে কনটেইনার স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দ্রুত পণ্য খালাস করতে আমদানিকারকদেরও চিঠি দিয়েছে তারা।
চামড়া, খাদ্য ও ওষুধ-সংশ্নিষ্ট শিল্প ছাড়া সব ধরনের শিল্পকারখানা ঈদের পর বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দর খোলা থাকলেও আমদানিকারকরা পণ্য খালাস করছেন না। এতে করে আমদানি পণ্যের জট লেগে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দুই-তিন দিনের মধ্যে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কনটেইনার জমে যাবে বন্দরে। আর তা যদি হয়, তবে জাহাজ থেকে আর কনটেইনার নামানোরই সুযোগ থাকবে না। অথচ বন্দর জেটিতে গতকালও ৯টি কনটেইনার জাহাজ ছিল। আর জেটিতে আসার অপেক্ষায় বহির্নোঙ্গরে দাঁড়িয়ে ছিল ২০টি জাহাজ। প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন পণ্যবোঝাই কনটেইনার রয়েছে এই ২৯টি জাহাজে।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক সোমবার দুপুরে জানান, বহির্নোঙ্গরে কনটেইনারবোঝাই ২০টি জাহাজ আছে। আর জেটিতে আছে ৯টি জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার কুদরত-ই-খুদা মিল্লাত জানান, ২০ ফুট দীর্ঘ প্রতিটি কনটেইনারে গড়ে প্রায় ১৬ টন পণ্য থাকে। রপ্তানি কনটেইনারে থাকে গড়ে ১২ টন পণ্য। এ হিসাবে জেটিতে থাকা ৪২ হাজার কনটেইনার ও ২৯টি জাহাজে খালাসের অপেক্ষায় থাকা ৩০ হাজার কনটেইনারে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য রয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্য খালাস করছেন না। দ্রুত পণ্য খালাস করতে আমরা বিভিন্ন ফোরামে চিঠি দিয়েছি। চট্টগ্রাম বন্দরে জট কমাতে সব ধরনের আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে সরিয়ে নেওয়ার অনুমোদনও চেয়েছি মন্ত্রণালয়ে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রোববার দুপুরে এ সংক্রান্ত দাপ্তরিক আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্থানান্তর প্রক্রিয়াও শুরু করছি আমরা। কিন্তু এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। কারণ ডিপোগুলোতেও জায়গার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দ্রুত পণ্য খালাস করা ছাড়া ভালো কোনো সমাধান আসবে না।
বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ৩৮ ধরনের পণ্য এখন বেসরকারি ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। বাকি পণ্য বন্দরে খালাস করতে হতো। নতুন আদেশ অনুযায়ী, আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের আমদানি পণ্য ডিপোতে নিয়ে খালাস করতে পারবেন আমদানিকারকরা। রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব মেহরাজ-উল-আলম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, বন্দরে কনটেইনারের জট নিরসনে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া সব ধরনের পণ্য চালান বেসরকারি ডিপোতে সংরক্ষণ, আনস্টাফিং ও ডিপো থেকে খালাসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আদেশে বন্দর থেকে ডিপোতে নেওয়ার সময় স্ক্যানিং এবং বাণিজ্যিক পণ্য ডিপো থেকে খালাসের সময় শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার শর্তও দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ও খালি কনটেইনার নিয়ে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হিমশিম খাচ্ছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম-কলম্বো রুটে জাহাজসংখ্যা বাড়িয়ে এ সমস্যা কিছুটা কাটিয়ে ওঠে তারা। তবে বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে এখনও আছে ১৩ হাজার পণ্যবোঝাই রপ্তানি কনটেইনার। এর মধ্যে সব ধরনের আমদানি কনটেইনার রাখার নতুন অনুমতি মেলাতে ব্যস্ততা বাড়বে বেসরকারি ডিপোর। এটি নিয়ে শঙ্কিত রপ্তানিকারকরা। কারণ রপ্তানি পণ্য শতভাগ প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ সম্পন্ন হয় বেসরকারি ডিপোতে। আমদানি পণ্যের জট কমাতে গিয়ে এখন রপ্তানি পণ্যের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা খোলা রাখার দাবি ছিল ব্যবসায়ীদের। সেটি করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তবে যে কোনো মূল্যে বন্দর সচল রাখতে হবে আমাদের। এখানে যাতে অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে সবাইকে। পরিবহনের কিছুটা সংকট থাকলেও বন্দর থেকে পণ্যবোঝাই কনটেইনার খালাস করতে কোথাও অসুবিধা হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা এ সুযোগটুকু গ্রহণ করতে পারেন।
এদিকে, বন্দর থেকে দ্রুত আমদানিকৃত কনটেইনার সরাতে শনিবার বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বিজিএমইর প্রথম সহসভাপতি এবং বিকেএমইএর সহসভাপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সময়সীমার মধ্যে কনটেইনার না সরালে কনটেইনারের ওপর ভাড়া আরোপের কঠোর হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জরুরি উদ্যোগ নিয়ে ঈদুল আজহার ছুটিতে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা চট্টগ্রাম বন্দর চালু রেখেছে। কিন্তু বন্দর চালু রাখা হলেও কনটেইনার বা পণ্য খালাসে উল্লিখিত সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বন্দরের অভ্যন্তর থেকে দ্রুত পণ্য খালাস না করলে দণ্ড ভাড়া আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, কঠোর লকডাউনের কারণে পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কনটেইনার খালাস কার্যক্রমও তাই বিঘ্নিত হচ্ছে। কলকারখানা খোলা রাখা হলে এ সংকট থাকত না। পর্যাপ্ত গাড়ি থাকত। ব্যবসায়ীরাও তাদের ইচ্ছামতো পণ্য পরিবহন করতে পারতেন। অন্যদিকে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, আমদানি কনটেইনার নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি সমাধান করতে হলে দ্রুত পণ্য খালাস করতে হবে ব্যবসায়ীদের। কারণ বেসরকারি ডিপোতে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সেখানে বড়জোর ১৫ হাজার আমদানি কনটেইনার স্থানান্তর করা যাবে। ডিপোতে আবার শতভাগ রপ্তানি কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আমদানি কনটেইনারের কারণে যাতে রপ্তানি কনটেইনারের কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বন্দরকে।



আরও পড়ুন

×