ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সরেজমিন কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা

কোটি টাকার 'খামোখা' ব্রিজ

কোটি টাকার 'খামোখা' ব্রিজ

কুমিল্লায় মেঘনা উপজেলার মানিকারচর বারহাজারী এলাকায় নির্মিত সেতু কোনো কাজে আসছে না - সমকাল

কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

প্রতিবছরই সরকারিভাবে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায়। কারণ মেঘনা ও কাঁঠালিয়া নদীবেষ্টিত এই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণের জন্য বরাদ্দ এ সরকারি অর্থের নয়ছয় হচ্ছে ব্যাপকভাবে।

সরেজমিনে এ উপজেলার দুটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, 'প্রয়োজন নেই' কিংবা 'জনগণের কোনো কাজেই আসবে না' এমন স্থানেও অপরিকল্পিতভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এক কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। বিলের মধ্যে তৈরি এসব ব্রিজ নির্মাণের প্রায় চার বছরেও অ্যাপ্রোচ সড়ক কিংবা বিলের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। কার্যত এসব সেতু স্থানীয় জনগণের কোনো কাজেই আসছে না।

প্রসঙ্গত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতাধীন মেঘনা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সালের ২৯ জুনে মেঘনা উপজেলার মানিকারচর ইউনিয়নের বারহাজারী স্কুুলসংলগ্ন এলাকায় ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি সেতু ও চেঙ্গাকান্দি গ্রামে একই দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সোহাগ এন্টারপ্রাইজ। ৩২ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৩ টাকা করে সেতু দুটির নির্মাণে ব্যয় হয় মোট ৬৫ লাখ পাঁচ হাজার ৩০৬ টাকা। এ ছাড়া একই উপজেলার লুটেরচর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর ঝিনঝিনি খালে ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল ৩০ লাখ ৯০ হাজার ২০ টাকা ব্যয়ে একই দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মাণ করে মেসার্স নূরজাহান এন্টারপ্রাইজ। ওই ইউনিয়নের লুটেরচর গহর মেম্বারের বাড়ির কাছে ৩২ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৩ টাকা ব্যয়ে আরও একটি সেতু নির্মাণ করে মেসার্স আদিবা বিল্ডার্স। এ চার সেতু নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয় মোট এক কোটি ২৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৯ টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুগুলো নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাটের কথা থাকলেও তা না করায় গত তিন-চার বছর ধরে এসব সেতু জনগণের কোনো কাজেই আসছে না। এ ছাড়া বিলের ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা ছাড়া এসব সেতু নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযোগ, ওই সময় মেঘনা উপজেলায় কর্মরত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আইমিন সুলতানাসহ সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাটের কাজ অসম্পূর্ণ রাখার পরও ঠিকাদারদের বিল পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলায় কর্মরত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আইমিন সুলতানার সঙ্গে গতকাল শুক্রবার বিকেলে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, দায়ও আমার একার না। ব্রিজ নির্মাণ বিষয়ে একটি কমিটি ছিল। ঠিকাদাররা কাজে অনিয়ম করে থাকলে তাদের জামানত ফেরত পরে কে দিয়েছে? আমি তো দিইনি।' তিনি আরও বলেন, 'সব জায়গায় আমাদের ক্ষমতা থাকে না। প্রকল্প তালিকা তো এমপি মহোদয় দিয়ে থাকেন।' স্থানীয় এমপি কিংবা মেঘনা উপজেলার বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি মোবাইল সংযোগ কেটে দেন।

মেঘনা উপজেলার বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম খান সমকালকে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধ তার এখানে যোগ দেওয়ার আগে হয়েছে। এসব সেতু ব্যবহার উপযোগী করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। তারা চেষ্টা করছেন সেতুগুলোকে জনগণের চলাচলের উপযোগী করার।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মনিরুল হক বলেন, সেতু নির্মাণের প্রকল্প দেওয়ার আগে জনগণের উপকারের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এসব সেতু হয়তো তৈরি করা হতো না। এসব সেতু ব্যবহারের উপযোগী করতেও অনেক অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন। তাই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×