ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

রাংসাকে ঘেরে পরিণত করেছেন প্রভাবশালীরা

রাংসাকে ঘেরে পরিণত করেছেন প্রভাবশালীরা

ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার রাংসা নদীতে ঘের দিয়ে পানিপ্রবাহ আটকে চলছে মাছ ধরা সমকাল

মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২১ | ১৩:৪৫

দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি নদী। কারণ কচুরিপানায় ছেয়ে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যেন গ্রামের বুক চিরে চলা বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। তবে যেসব স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে, শুধু সেখানেই পানি চোখে পড়ছে। বেহাল এ নদীটির নাম রাংসা। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার এ নদীটি এখন গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের। নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ করে ঘের দিয়ে মাছ চাষ এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেওয়ায় ফসলি জমি হয়ে পড়ছে অনাবাদি। এর মধ্যে রাংসার বুকে শেষ পেরেক হিসেবে ঢুকেছে বালু তোলা ড্রেজার।
রাংসা শুরু হয়েছে ফুলপুর উপজেলার দক্ষিণে বুড়বুড়িয়া বিল থেকে। তারাকান্দা উপজেলার ঢাকুয়া এলাকায় ধলাই নদীর সঙ্গে মিশে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার মগড়া নদীতে মিলেছে। নদীটির নাম নিয়ে রয়েছে লোকশ্রুতি। রাংসা শব্দটি মূলত মান্দিরা (গারো) নিজেদের নামের টাইটেল হিসেবে ব্যবহার করে। নদীটি ঘিরে মান্দিদের বসবাস বেশি। সেখান থেকেই এ নাম হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
তারাকান্দা উপজেলার একমাত্র এ নদীটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। ২০ বছর আগেও নদীতে ট্রলার, নৌকা চলত। এখন নদীজুড়ে কচুরিপানার আস্তরণ। তা ছাড়া অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ পানিপ্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালীদের থাবায় নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপজেলায় জলাবদ্ধতা সংকট প্রকট। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি আমন মৌসুমে অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমিতে কৃষক চাষাবাদ করতে পারেননি। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। সরেজমিন দেখা গেছে রাংসার করুণ চিত্র। তারাকান্দা উপজেলার কাকনী ইউনিয়নের দাদরা বাজারটি রাংসার তীরে। বাজারের পাশে সেতুর অপর প্রান্তে কদমতলী বাজার। এই সেতুতে দাঁড়িয়ে নদীর রেখা দেখা গেলেও পানির দেখা মেলা ভার। কচুরিপানায় ঢাকা পড়েছে নদী। এর মধ্যেই অন্তত পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে চলছে বালু উত্তোলন। তার মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা সবিকুল ইসলাম তিন ভাই মিলে বসিয়েছেন দুটি ড্রেজার। নিজেদের পুকুর ভরাটের জন্য বালু তুলছেন তারা। তবে এ বিষয়ে তাদের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
শুধু দাদরা এলাকা নয়, নদীজুড়েই বাঁশের বানা নিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে জালের ঘের দিয়ে মাছ চাষ করছেন প্রভাবশালীরা। এতে মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটলেও মরতে বসেছে রাংসা। স্থানীয়রা জানান, উপজেলাজুড়েই অপরিকল্পিত পুকুর খনন, খাল-বিল দখল করে মাছ চাষ করায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পানি আটকে কৃষকের ফসলের আবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অবশ্য উপজেলা প্রশাসন পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এতে কিছু এলাকায় সুফল পাওয়া শুরু হলেও স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
দাদরায় সেতুতে দাঁড়িয়ে কথা হয় মিলম মিয়া ও দুলাল মিয়ার সঙ্গে। তারা জানালেন, নদীটি দেড় দশক আগেও সচল ছিল। পানির প্রবাহ না থাকায় তারা ফসল চাষ করতে না পেরে ক্ষতির মুখে রয়েছেন। প্রতিবন্ধকতা দূর করে নদীটি সচল করার দাবি জানান তারা।
তারাকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিব-আল-রানা বলেন, উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমি অনবাদি রয়েছে। তার মধ্যে কাকনী, বানিহালা, বালিখা ও কামারিয়া ইউনিয়নেই অন্তত চার হাজার হেক্টর। তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
কাকনী ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান রিপন বলেন, নদী দখল করে মাছ চাষ করায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। দাদরা বাজার এলাকায় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন আন্দোলন-ময়মনসিংহের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন বলেন, নদীটির বর্তমান অবস্থা জীববৈচিত্র্যে চরম নেচিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। বর্তমান অবস্থার দায়ও প্রশাসনের।
তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজাবে রহমত বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। নদী ও খালে বাঁধ অপসারণ করা হচ্ছে। নদীটি খননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। আর ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলতে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন

×