২০১৯ সালের ১৫ মার্চ শুক্রবার জুম্মার নামাজ চলাকালীন সময়ে নিউজল্যিান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা গোটা বিশ্বকে স্তদ্ধ করে দিয়েছিল। ওই হামলায় সে সময় ৫১ জন নিহত হন। এরপরই দেশটির নেতৃবৃন্দ গোটা দেশে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন ওই হামলার পর বলেছিলেন, কেন এমন হামলা হয়েছে এর উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে আমরা কারণগুলো খুঁজে বের করবো। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।

হামলার ওই ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে জেসিন্ডা আর্ডেন নিউজিল্যান্ডে বিদ্যমান অস্ত্র আইন পরিববর্তনের ঘোষণা দেন।

এর কয়েক দিনের মধ্যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক বৈঠকে তাকে হিজাব পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। একজন প্রধানমন্ত্রীর এমন সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ নিয়ে গোটা বিশ্বে ওই সময় ব্যাপক আলোচিত হয়।
জেসিন্ডা আর্ডেন হন প্রশংসিত।  চার সপ্তাহের মধ্যে নিউজিল্যান্ডে অস্ত্র আইন পরিবর্তন সর্বসম্মতিক্রমে দেশটির সংসদে পাশ হয়।আর দুই মাসের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেসিন্ডা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব ব্যাপী প্রচারণা গড়ে তোলেন।

মসজিদে ওই হামলার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ব্রেন্টন টারান্টকে ঘটনার পর পরই গ্রেপ্তার করা হয়। ৫১ জনকে হত্যা, ৪০ জনকে হত্যাচেষ্টা এবং সন্ত্রাসবাদী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের শুনানি চলছে। চারদিন ধরে এই শুনানি চলবে।

শুনানিতে জানা যায়, ২০১৭ সালে ব্রেন্টন মসজিদে আক্রমণটির পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল যতটা সম্ভব মানুষ হত্যা করার। তিনি মসজিদগুলিকে পুড়িয়ে দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছিলেন।

উনত্রিশ বছরের ব্রেন্টন টারান্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে, যেখানে কোনরকম প্যারোলের সুযোগ থাকবে না। নিউজিল্যান্ডে এর আগে কাউকে এরকম সাজা দেয়া হয়নি। 

যদিও ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমরা নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছেন, তবে বেশিরভাগই অভিবাসীর সম্প্রদায়ের। এদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ। ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী পল স্পুনলি বলেন, মসজিদে হামলার আগে দেশটির অনেক নাগরিকই নিউজিল্যান্ডে কত মুসলিম  বসবাস করেন তা জানতেন না। দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় জানায়, নিউজিল্যান্ডে সব সময় বর্ণ বৈষম্য ছিল।

মসজিদে হামলার ঘটনার পাঁচ বছর আগে বেসরকারি সংস্থা ইসলামিক উইমেন কাউন্সিল নিউজিল্যান্ড (আইডাব্লুসিএনজেড)  দেশটির সরকারি একাধিক সরকারি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে নিয়মিতভাবে মুসলমানদের প্রতি শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতনের বিষয়ে অবহিত করে। বিশেষ করে হিজাব পরা নারীরা যে বর্ণবাদের শিকার হতেন সেটা জানাতেন।  তবে মসজিদে হামলার ঘটনায় বহু বছর পর মুসলিম সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে তারা যে বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন তা জানানোর সুযোগ পান।

হামলার পর থেকে আল নূর মসজিদের ইমাম জামাল ফাওদা এবং অন্যান্য মুসলিম নেতারা  যে কোনও বর্ণবাদী কার্যকলাপের রিপোর্ট করার জন্য পুলিশ এবং সুরক্ষা বাহিনীর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে পারছেন। ফাওদা জানান, এখনও এ ব্যাপারে অনেক ধরনের সমস্যা আছে। তবে তিনি এটাও জানান, জনগণ যাতে নিরাপদে থাকে এজন্য দেশটির সরকার সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছে।

অনলাইন উগ্রবাদীদের উপর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জানা গেছে, নিউজিল্যান্ডে এখনও প্রায় এক ডজন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্ণবাদ বৈষম্য দূর করতে  হলে মানসিকতা পাল্টাতে হবে। তাদের মতে, বর্ণবাদ বিদ্বেষ অনেকটা ভাইরাসের মতো। যেভাবে কোভিডকে-১৯ মোকাবিলা করা হচ্ছে সেভাবেই বর্ণবাদ মোকাবিলা করতে হবে।  আক্রমণাত্মকভাবে এবং সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে এটা প্রতিহত করতে হবে যাতে এটি ছড়িয়ে না পড়ে বা ধ্বংস ডেকে না আনে।

ফওদা বলেন, নিউজিল্যান্ডে এবং অন্য কোথাও স্থানে ক্রাইস্টচর্চ হামলার মতো এমন ঘটনা প্রতিহত করতে সব সম্প্রদায়ের একসাথে কাজ করা জরুরি। সূত্র: সিএনন

মন্তব্য করুন