ফরেনসিক সেবা বদলে যাবে ১৬ জেলায়
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪৬
এখন থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত
ঢাকায় পাঠাতে হবে না। রাজশাহীর পুলিশ লাইন্সে চালু হচ্ছে সিআইডির বিভাগীয়
ফরেনসিক ল্যাব। ৩ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করবেন পুলিশ মহাপরিদর্শক ড.
মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।
এ ল্যাবরেটরি চালু হওয়ার ফলে রাজশাহী ও রংপুর থেকে শুধু ফৌজদারি নয়,
দেওয়ানি মামলার জব্দ আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ মতামত
দেওয়া যাবে। ঢাকায় আলামত পাঠাতে না হওয়ায় মতামত দিতে সময় কম লাগবে।
পরীক্ষার গুণগত মানও বাড়বে।
আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থায় মামলার যে কোনো আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন
তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় অপরাধীরা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সত্য লুকানোর চেষ্টা
করে। তখন মাসের পর মাস মামলার তদন্ত চলতে থাকে। এসব পরিস্থিতিতে আলামতের
ফরেনসিক পরীক্ষার ফল মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সঠিকভাবে আলামত সংরক্ষণ
না করলে অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় প্রত্যন্ত এলাকা
থেকে মামলার আলামত ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক
ল্যাবে পাঠাতে হয়। এতে লম্বা সময় ব্যয় হওয়ায় অনেক জৈবিক আলামতের মান
সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। রাজশাহীতে বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব চালু হওয়ায় তাই
এখানকার এবং পাশের বিভাগ রংপুরে মামলার তদন্তে গতি আসবে।
ফরেনসিক ল্যাবের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে সব ধরনের মাদকদ্রব্য, মৃত মানুষ বা
পশু-পাখির ভিসেরা প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে। কবর থেকে তোলা হাড়, চুল, মাটি,
সফট টিস্যু, বিষাক্ত বা চেতনানাশক পদার্থ, রক্ত ও অ্যাসিডের উপস্থিতি এবং
বিস্ম্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ, জাল টাকা তৈরিতে ব্যবহূত রাসায়নিক শনাক্ত
করে মতামত দেওয়া যাবে।
ফরেনসিক ল্যাবের আরেকটি বিশেষ শাখা ফিঙ্গার প্রিন্ট। এ ক্ষেত্রে ক্রাইম সিন
থেকে সংগৃহীত দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান আঙুলের ছাপের সঙ্গে সন্দেহভাজন
আসামিদের ছাপের তুলনামূলক পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া হয়। এ ছাড়া
সংগৃহীত ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে ডাটাবেজে থাকা ফিঙ্গার প্রিন্টের মিল-অমিল
খুঁজে বের করা যায়। বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিদ্যমান দলিলের
লেখা বা স্বাক্ষর জাল কি-না, ঘষামাজা করে অবলোপন করা হয়েছে কি-না ইত্যাদি
বের করা যায়।
জাল নোট শনাক্তকরণ এ ল্যাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এ ক্ষেত্রে
দেশি-বিদেশি সব নোট, সব ধরনের কয়েন বা ধাতব মুদ্রার বিষয়ে ভিডিও স্পেকট্রাল
কম্পারেটরের মাধ্যমে নোটে থাকা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বৈশিষ্ট্যগুলো
বিশ্নেষণের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া হয়।
ফরেনসিক ল্যাবে ফটোগ্রাফি শাখাও রয়েছে, যেখানে অপরাধীদের ছবি তুলে সংরক্ষণ
করা হয়। এর ফলে সন্দেহভাজনদের ছবির সঙ্গে নমুনা ছবির মিল রয়েছে কি-না তা
বের করা সম্ভব হয়।
গুলির ধরন দেখেও অপরাধীদের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পায় পুলিশ। কোনো ঘটনায়
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকলে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতের ফরেনসিক
পরীক্ষা করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র, কার্তুজ, ফায়ার্ড কার্তুজ, ফায়ার বুলেটের
অংশবিশেষ পরীক্ষার পর দেওয়া হয় মতামত। এ ছাড়া গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর,
আগ্নেয়াস্ত্রের নম্বর, ট্রেডমার্ক, কোনো ধাতব বস্তুর ওপর থেকে মুছে ফেলা বা
বিকৃত লেখা, যে কোনো বিশেষ চিহ্ন পরীক্ষার পরও প্রতিবেদন দেওয়া হয় ফরেনসিক
ল্যাব থেকে। পদচিহ্ন বা জুতার ছাপ পরীক্ষা করে অপরাধী বা ভিকটিম শনাক্ত
করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ল্যাবের। অপরাধস্থল পরিদর্শন করে বস্তুগত
সাক্ষ্য সংগ্রহ, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, স্কেচ ম্যাপ প্রস্তুত করে ফরেনসিক
ল্যাবের মাধ্যমে তদন্ত ইউনিটকে দেওয়া হয়।
সিআইডির প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, রাজশাহীতে ফরেনসিক
ল্যাবরেটরি চালু হলে দ্রুত নানা আলামতের প্রতিবেদন পাওয়া সম্ভব হবে।
ন্যায়বিচার অল্প সময়েই পাওয়া নিশ্চিত করা যাবে।
সিআইডির ডিআইজি (ফরেনসিক) শেখ নাজমুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ৩০-৩৫ জনকে
নিয়ে রাজশাহীতে ফরেনসিক ল্যাবরেটরির কার্যক্রম শুরু হবে। ঢাকার বাইরে শুধু
চট্টগ্রামে ল্যাবরেটরি রয়েছে। রাজশাহীতে এ কার্যক্রম শুরু হলে ফৌজদারি ও
দেওয়ানি মামলার আলামত পরীক্ষায় বিশাল এলাকার জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) রুমানা আক্তার বলেন, ফরেনসিক ল্যাবে
যে কোনো ফৌজদারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বিনা খরচে করা যায়। অনেক ক্লুহীন
ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষায়।
- বিষয় :
- ফরেনসিক সেবা