ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লিট ফেস্ট

গুরনাহ অমিতাভ ফারাহতে মুগ্ধতা

গুরনাহ অমিতাভ ফারাহতে মুগ্ধতা
×

বাংলা একাডেমিতে বৃহস্পতিবার লিট ফেস্টের উদ্বোধন অনুষ্ঠান সমকাল

হামিম কামাল

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৩ | ২০:২২

সূচনা সংগীতের মধ্য দিয়ে সকাল ৯টায় লিট ফেস্ট যখন শুরু হলো, সূর্য তখন কুয়াশার আড়ালে। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে বাংলা একাডেমির বাইরে সমাগম ক্রমেই বাড়ছিল। তাঁদের মাঝে ছিলেন কৌতূহলী চোখের বিদেশি অভ্যাগত, হাসিখুশি ছাত্রছাত্রী, সাহিত্য অনুরাগী, মিডিয়া পাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা দেশি-বিদেশি সাংবাদিকসহ ব্যস্ত স্বেচ্ছাসেবীরা।

সকাল ১০টায় আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে স্বনামখ্যাত সাহিত্যিকরা একে একে আসন নিলেন। প্রথম সারিতে ছিলেন নোবেলবিজয়ী তানজানীয় সাহিত্যিক আবদুলরাজাক গুরনাহ, অমিতাভ ঘোষ, নুরুদ্দিন ফারাহ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সঙ্গে অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্বোধনের সাংস্কৃতিক অংশ সাজানো হয়েছিল। নৃত্যগোষ্ঠী নৃত্যানন্দ পরিবেশন করে মণিপুরি নৃত্য। এছাড়া রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশিত হয়। ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা হিসেবে ঢোলনৃত্য অত্যন্ত প্রশংসিত হয়। আবদুলরাজাক গুরনাহ মণিপুরি নৃত্যের আলোঝলমল পোশাক ও প্রতীকী মুদ্রার পাশাপাশি ঢোলনৃত্যকে অত্যন্ত শক্তিময় বলে অভিহিত করেন। অমিতাভ ঘোষের বাংলাদেশ নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য সবার হৃদয় কাড়ে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে দশম লিট ফেস্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন সাদাফ সায, আহসান আকবর ও কাজী আনিস আহমেদ। সামনের দিনগুলোয় আরও ঋদ্ধ অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তাঁরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে মনে হয়েছিল, সূর্য এদিন মুখ দেখাবে না। তবে অনুষ্ঠান এগোতে শুরু করলে ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে য়ায়। সূর্য আলো ছড়াতে শুরু করে। দর্শনার্থীরা মেলার বইয়ের স্টলগুলো ঘুরে দেখতে থাকেন। বিদেশি লেখকদের মৌলিক গ্রন্থের পাশাপাশি দেশি লেখকদের ইংরেজিতে অনূদিত সাহিত্যকর্ম নেড়েচেড়ে দেখেন তাঁরা। খাবারের দোকানগুলোয় বাড়তে থাকে ভিড়।

বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানমালার মাঝে ছিল ছোট ছোট বিরতি। দুপুর সোয়া ১২টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে টর্ন অ্যাপার্ট অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন ২০২২ সালের বুকার বিজয়ী শ্রীলঙ্কার লেখক শেহান করুণাতিলকা ও এর আগে আন্তর্জাতিক বুকার বিজয়ী ভারতীয় লেখক গীতাঞ্জলি শ্রী। নিজ দেশের নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন শেহান। গীতাঞ্জলি শ্রীর বক্তব্যে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি উঠে আসে আশাবাদ। একই সময়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন
ম হামিদ, আবদুল মান্নান, মিনার মনসুর ও নাসির আলী মামুন। দেশের অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকটের কথা উঠে আসে আলোচনায়।

লিট ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জেমকন সাহিত্য পুরস্কার বিতরণ। জনাকীর্ণ মিলনায়তনে করতালিতে অভিনন্দিত হন এবারের সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী কবি কামাল চৌধুরী। 'স্তব্ধতা যারা শিখে গেছে' কাব্যগ্রন্থের জন্যে তিনি পুরস্কার পান। তরুণ কথাসাহিত্যিক সাজেদুল ইসলাম পুরস্কার পেয়েছেন 'ঘুমিয়ে থাকা বাড়ি' উপন্যাসের পান্ডুলিপির জন্য। তরুণ কবি সাকিব মাহমুদ পুরস্কার পেয়েছেন 'সোনার নাও পবনের বৈঠা' কবিতাগ্রন্থের পান্ডুলিপির জন্য। অনুষ্ঠানমঞ্চে ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, কবি জয় গোস্বামী, সাহিত্যিক তপোধীর ভট্টাচার্য, অধ্যাপক সৈয়দা আক্তার, কবি শামীম রেজা, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ প্রমুখ। কবি কামাল চৌধুরীর হাতে পদকসহ পাঁচ লাখ টাকা ও তরুণ পুরস্কৃতদের হাতে পদকসহ এক লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়।
সূচনালগ্ন থেকে লিট ফেস্টের শুভাকাঙ্ক্ষীদের একজন প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদ স্মরণে অনুষ্ঠিত হয় ইন মেমরিয়াম। এছাড়া নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূনের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'মশারি'কে ঘিরে আগতদের আগ্রহ ছিল। বেলা পৌনে ৩টায় আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে এটি প্রদর্শিত হয়।
ভাস্কর নভেরা হলে অনুষ্ঠিত হয় টি. এস. এলিয়টের দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডের বাংলা অনুবাদ (অনুবাদক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা) আবৃত্তি অনুষ্ঠান, লনে অনুষ্ঠিত হয় প্রকাশনা শিল্পবিষয়ক আলোচনা আউট অব প্রিন্ট, কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত হয় ছোট গল্প নিয়ে লেখক-পাঠক মুখোমুখি অনুষ্ঠান 'বড় চিন্তা, ছোট গল্প', একই হলে 'ভার্চুয়াল সময়ে কবিতা', ভাস্কর নভেরা হলে অনুষ্ঠিত হয় 'সিস্টার্স ইন রেজিস্ট্যান্স', একই হলে নুহাশ হুমায়ূনের 'পেট কাটা ষ'-এর প্রদর্শনী হয়। লনে দেবী সুলতানার যাত্রা ও বর্ধমান হাউসে সান্ধ্য আয়োজনে মেঘদলের সংগীত ও সংগীতবিষয়ক কথোপকথন নিয়ে আলোচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ধ্রুপদি সংগীত হয়।

লিট ফেস্টের দশম আয়োজনে প্রথমবারের মতো ছিল টিকিট ব্যবস্থা। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও সার্বিকভাবে আনন্দঘন পরিবেশ বজায় ছিল। বহু বর্ণিল ও বহুত্ববাদী এমন আয়োজন মুগ্ধ করেছে দর্শনার্থীদের।


আরও পড়ুন

×