ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আ'লীগের সঙ্গে টানাপোড়েন ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের

আ'লীগের সঙ্গে টানাপোড়েন ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের
×

শাহেদ চৌধুরী

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ২০:০৮

জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-৩ এবং বগুড়া-৪ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের (ইনু) টানাপোড়েন চলছে। এই দুই আসনে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের নেতাকর্মীর মধ্যে এক ধরনের দূরত্বও তৈরি হয়েছে।
আগামী ১ ফেব্রুয়ারি এই দুটি আসনসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এবং বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির ছয় এমপি পদত্যাগ করায় আসনগুলো শূন্য হয়েছে। এই আসনগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী দিলেও ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টি ও বগুড়া-৪ আসনে জাসদকে ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে প্রার্থী নেই দলটির।

ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ নেতাদের অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির ইয়াসিন আলী এবং বগুড়া-৪ আসনে জাসদের এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন ১৪ দলের মনোনয়ন পেলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। তাঁরা বলেছেন, ওই দুই প্রার্থীই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ করছেন না। তবুও আগ বাড়িয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
এ অবস্থায় ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের সঙ্গে দূরত্ব মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁও এবং বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছেন। তিনি ওই বার্তায় ঠাকুরগাঁও-৩ এবং বগুড়া-৪ আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের প্রার্থীদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে সার্বিক সহযোগিতার জন্য সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও-৩ আসনটি নৌকা প্রতীকের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীর দৃষ্টিতে, আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী ইয়াসিন আলী ২০১৪ সালে পেলেও ২০১৮ সালে হেরেছেন। জয় পাওয়ার মতো নিজস্ব ভোট নেই তাঁর। এ জন্যই আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী নিজেদের নিষ্ফ্ক্রিয় করে রেখেছেন। রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী জানিয়েছেন, নেতাকর্মীকে সক্রিয় করার জন্য তিনি এরই মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সমকালকে জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত নির্বাচনসংক্রান্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীর একটি অংশ ইতিবাচক মনোভাব দেখায়নি। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর পক্ষে প্রচার কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পর সার্বিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটছে।
বগুড়া-৪ আসনে জাসদের প্রার্থী এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনকে নিয়েও এক রাজ্যের অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে ১৪ দলের সমর্থনে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার অভিযোগ রয়েছে। এবারও তিনি যোগাযোগ রাখছেন না বলে জানিয়েছেন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মজিবুর রহমান মজনু। এ কারণেই ভোটের মাঠে তাঁর পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর কাজ করার আগ্রহ কম।

এ ব্যাপারে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়েই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাসদের প্রার্থী রেজাউল করিম তানসেন। সুতরাং যোগাযোগ না রাখার দাবি ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে রেজাউল করিম তানসেনের বিজয় সুনিশ্চিত করতে সার্বিক সহযোগিতার জন্য আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ নির্দেশের পর সবাই সক্রিয় হচ্ছেন।
আওয়ামী লীগে বিদ্রোহ :সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের যে কোনো নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিস্কারের হিড়িক পড়েছিল আওয়ামী লীগে। আবার বহিস্কৃতদের অনেকে ক্ষমা চেয়ে আবেদনও করেছেন। এ অবস্থায় দলের জাতীয় সম্মেলনের আগে বহিস্কৃতদের ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, দলীয় সিদ্ধান্তের আর অমান্য হবে না। কিন্তু সেই একই চিত্র। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ এবং বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করছেন বিদ্রোহীরা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলের রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, বিদ্রোহীদের ক্ষমা করা হয়েছে। কিন্তু নতুন করে কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তাঁকে অবশ্যই বহিস্কার করা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী জিয়াউর রহমানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন খুরশেদ আলম বাচ্চু। দলের একটি অংশ এই বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন করছে। সেই সঙ্গে এ আসনের সাবেক এমপি গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের অনুগত সমর্থকদেরও সন্দেহের চোখে দেখছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। রাজশাহী জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকারও এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সামিউল হক লিটন। এ আসনেও গৃহদাহ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে হেরে ক্ষুব্ধ সামিউল হক লিটনের সমর্থকরা তাঁর পরাজয়ের জন্য আবদুল ওদুদকে দুষছেন। তাঁরা মরিয়া হয়ে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে নেমেছেন।
বগুড়া-৬ আসনেও একই চিত্র। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে আছেন বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মান্নান। তিনি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাঁর পক্ষে রয়েছে। এ ছাড়াও দলের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন সম্মেলনসহ ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে রাগেবুল আহসান রিপুর ওপর অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন।

নৌকা ঠেকাতে বিদ্রোহীর পক্ষে বিএনপি-জামায়াত :চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বনিবনা নেই দলের গোমস্তাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের। দুই নেতাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি। দলীয় টিকিটে এ আসনে ২০০৮ সালে জিয়া এবং ২০১৪ সালে মোস্তফা জয় পান। দুই নির্বাচনেই তাঁরা পরস্পরের মনোনয়ন মেনে নেননি। ২০১৮ সালে দলের মনোনয়ন ফিরে পেলেও গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের সমর্থন জোটেনি জিয়াউর রহমানের।
ফলে আসনটি হাতছাড়া হয় আওয়ামী লীগের। নির্বাচিত হন বিএনপির আমিনুল ইসলাম। তিনি উপনির্বাচনে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে। তাঁর সমর্থক বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খুরশেদ আলম বাচ্চুর পক্ষে প্রচ্ছন্নভাবে একাট্টা হয়েছেন। গোমস্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য খুরশেদ আলম বাচ্চু বিএনপির সাবেক নেতা। এ কারণে তাঁর প্রতি দুর্বলতা রয়েছে বিএনপি-জামায়াতের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল ওদুদকে হারানোর জন্য স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা। বিদ্রোহী প্রার্থী সামিউল হক লিটনের সমর্থকরা জয়ের আশায় বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এ বিরোধের সুযোগ নিতে চাইছেন বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও। তাঁরা আবদুল ওদুদকে ঠেকানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নৌকার নেতাকর্মীর হাতুড়ি ও মশালে অস্বস্তি :ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির ইয়াসিন আলী হাতুড়ি এবং বগুড়া-৪ আসনে জাসদের এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন মশাল প্রতীকে লড়ছেন। ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে এই দুই প্রার্থীকে হাতুড়ি ও মশাল প্রতীকে ভোট দেওয়ার কথা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীর। কিন্তু ভোটের আগেই এ নিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। নৌকা প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দিতে অভ্যস্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হাতুড়ি ও মশাল প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দিতে পারছেন না।

মহাজোটে নেই জাতীয় পার্টি
জাতীয় পার্টির মহাসচিব অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু সমকালকে বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক। তাই নির্বাচনের পর মহাজোটে নেই জাতীয় পার্টি। এ কারণেই উপনির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা হয়নি। জাতীয় পার্টি ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে হাফিজ উদ্দীন আহমেদ, বগুড়া-৪ আসনে শাহীন মোস্তফা ফারুক, বগুড়া-৬ আসনে নুরুল ইসলাম ওমর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×