কোটা পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন
অতীতের তুলনায় পিএসসির প্রার্থী বাছাই এখন স্বচ্ছ
সাক্ষাৎকারে বিদায়ী চেয়ারম্যান
ইকরাম আহমেদ
সাবি্বর নেওয়াজ
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০১৬ | ১৩:২৯
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ বলেছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে পিএসসির প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া এখন অধিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে। তার দাবি, কেউ এখন অস্বচ্ছতা ও অসততার অভিযোগ তুলতে পারবেন না। অতীতের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি এখন সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের মর্যাদা ও আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন
করা হয়েছে। এক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি সেই কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে। গত সাতটি বিসিএসে পিএসসি ১৮ হাজার ৬০০ প্রার্থী নিয়োগের সুপারিশ করেছে। একই সময়ে ২০ হাজার ৫শ'র বেশি প্রার্থীকে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরেও বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পদ শূন্য না থাকায় সুপারিশ না পাওয়া এক হাজার ৭০০ প্রার্থীকে প্রথম শ্রেণীর ও ৫২৮ জনকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। গত সোমবার নিজ কার্যালয়ে সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিএসসির বিদায়ী চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের '৮১ ব্যাচের কর্মকর্তা ইকরাম আহমেদ ২০০৯ সালে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর নেওয়ার পর জুলাই মাসে পিএসসির সদস্য হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ তিনি পিএসসি থেকে বিদায় নেবেন। ইকরাম আহমেদ ১৯৫১ সালের ১৪ এপ্রিল পিরোজপুর জেলায় জন্ম নেন। সিভিল সার্ভিসে বর্ণাঢ্য ও গৌরবোজ্জ্বল চাকরিজীবনের অধিকারী ইকরাম আহমেদ অতিরিক্ত সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে যুগ্ম সচিব, সমবায় অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক এবং জেলা প্রশাসকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
পিএসসিতে প্রায় আড়াই বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইকরাম আহমেদ সমকালকে বলেন, এ সময়ে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির নানা পরিবর্তন এসেছে। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারার মতো গুণাবলিসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করছে পিএসসি। জনসেবার মানসিকতা, জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল, উদ্যমী, নির্ভয়ে কাজ করার শক্তি, সততা ও নিষ্ঠাবান প্রার্থী বাছাই করা পিএসসির বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাগত ক্ষেত্রে ভালোমানের শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতির আলোকে যথাযথ সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য উপযুক্ত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস শতভাগ বন্ধের জন্য তিনি যে নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করেছেন, তার বিশদ বিবরণ দিয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন বিশেষজ্ঞরাই করেন। এর সঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান, সদস্য কিংবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। মৌখিক পরীক্ষায়ও শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে সব ধরনের তদবির অগ্রাহ্য করা হয়।
ইকরাম আহমেদ জানান, ২৭তম বিসিএসের দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা থেকে তিনি পিএসসিতে যোগ দিলেও মূলত ২৯তম বিসিএস থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে ৩৫তম বিসিএসের ফল প্রকাশের কাজ চলছে। ৩৭তম বিসিএসের প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা হয়ে গেছে। ৩৮তমের সার্কুলার হয়েছে। ২৯তম বিসিএস থেকে এ পর্যন্ত ক্যাডার পদে প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়েছে। ৩৫তম বিসিএসের শিগগিরই ফল প্রকাশ হতে যাচ্ছে। এই বিসিএসেও প্রায় ২ হাজারের বেশি প্রার্থীকে তারা সুপারিশ করতে পারবেন বলে মনে করছেন। এই সময়কালে প্রায় ২০ হাজার ৫শ'র বেশি প্রার্থীকে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরেও বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পদ শূন্য না থাকার কারণে সুপারিশ না পাওয়া এক হাজার ৭০০ প্রার্থীকে প্রথম শ্রেণীর ও ৫২৮ জনকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে বিভিন্ন কোটা বলবৎ আছে। নানা যৌক্তিক কারণে আপাতত বেশকিছু কোটা চালুর প্রয়োজন রয়েছে, সুযোগও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ভারতেও অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য নানা কোটা চালু রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে কোটা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও জেলা কোটা রয়েছে। এই কোটা পদ্ধতির প্রয়োগ একটি জটিল সমীকরণ। দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদ সবসময় পূরণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেশাগত ক্যাডারে এই কোটায় যোগ্য প্রার্থী অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে পদ শূন্য থেকে যায়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য আয়োজিত বিশেষ বিসিএসেও দেখা গেছে, পেশাগত ক্যাডারের বেশকিছু পদ শূন্য থেকে গেছে। এ অবস্থার উত্তরণে কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রপতির কাছে কোটা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করে আসছে পিএসসি। কী করা উচিত সে সম্পর্কে আমরা কিছু বলিনি, এটা সরকারের ব্যাপার। আমরা শুধু কোটা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছি।
'অতীতে নিয়োগ নিয়ে পিএসসির ওপর সরকারি চাপ আসত, বিশেষ ভবন থেকে তালিকা পাঠানো হতো বলে নানা অভিযোগ ছিল। বর্তমানেও এমন কিছু আছে কি-না' জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, তার আড়াই বছরে নিয়োগ নিয়ে কোনো মহল থেকে তিনি কোনো রকম কোনো চাপ অনুভব করেননি। তবে পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সামাজিক মানুষ। কখনও কখনও কেউ কোথাও ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কোনো অনুরোধ করলে করতে পারেন। তবে এর কোনো প্রতিফলন পরীক্ষা পদ্ধতিতে পড়ে না। যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়, তাতে কোনো তদবিরের প্রতিফলন ঘটানো কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সদস্যদের কেউ জানেনই না, তিনি সেদিন মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড আদৌ পাবেন কি-না। আবার পেলেও কত রোল নম্বর থেকে কত নম্বর পর্যন্ত তিনি পাবেন, সেটি বোর্ডে আসার আগে পর্যন্তও তিনি জানেন না।
'দলীয় সরকারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যান সদস্যরা কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ নিরপেক্ষতা দেখাতে পারেন কি-না' প্রশ্নের জবাবে ইকরাম আহমেদ বলেন, সরকারই নিয়োগ দেয়, রাষ্ট্রপতি দেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, সমস্যাও নেই। সংবিধানের অধীনে আমরা শপথ নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিন্তু শপথ নেন না। বর্তমানে কমিশনে যারা আছেন, তারা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, পিএসসিতে বর্তমানে বিতর্কিত কেউ নেই।
কথা প্রায় শেষ। তখনই পিএসসির চেয়ারম্যান বললেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম স্মরণ রাখে, সেজন্য সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিসিএসের নতুন পাঠ্যসূচিতে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রাম এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মেয়াদ শেষ নিজের উত্তরসূরির উদ্দেশ্যে পিএসসি চেয়ারম্যান বলেন, তাকে পরীক্ষার পদ্ধতি ডিজিটালাইজ করার কাজ আরও এগিয়ে নিতে হবে। পিএসসির জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। বিসিএস পরীক্ষা গ্রহণের সময়সীমাও আরও কমিয়ে আনতে হবে।