যেভাবে খাবারের মাধ্যমে শরীরে ঢুকছে সুপারবাগ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০১৯ | ০৪:১৯ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০১৯ | ০৪:৩১
চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্য হাসপাতালের আইসিইউ'তে থাকা রোগীদের একটি বড় অংশের মৃত্যু হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) আইসিইউ'তে মোট ৯০০ রোগী ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৪০০ জন মারা যায়। এদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা 'সুপারবাগ' পাওয়া যায়।
বিএসএমএমইউ'র ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, যেসব ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মানুষের শরীরকে আক্রমণ করে, তারা দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের সংস্পর্শে থাকার কারণে ওইসব ওষুধ থেকে বেঁচে যাওয়ার কিছু ক্ষমতা অর্জন করে। এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স'।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল) গাভীর খাবার, দুধ, দই ও প্যাকেট-জাত দুধ নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা জরিপ করে। এর ফলাফল উঠে আসে, গাভীর দুধে (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান রয়েছে। পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। একই সঙ্গে প্যাকেট-জাত গাভীর দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত।
এনএফএসএলের এই গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লুৎফুল কবির বলেন, যেসব উপাদান পাওয়া গেছে, এর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদানই বেশি—টেট্রাসাইক্লিন, এনরোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোসিন ও আফলাটক্সিন অ্যান্টিবায়োটিক। এগুলো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি থাকা মানে যেকোনো বয়সী মানুষের শরীরে এগুলো ঢুকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেবে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসট্যান্স হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন- নির্দিষ্ট সময়মাফিক অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া বা প্রয়োগ না করা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ইচ্ছামাফিক খাওয়া (২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সায়েন্টিফিক রিসার্চের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি তিনজন রোগীর একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকেন), বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করার ফলে।
লুৎফুল কবির আরও বলেন, আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাচ্ছি তার অনেকগুলো থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন- মুরগীর মাংস, গরু, ছাগল বা খাসীর মাংস, দুধ এবং দুগ্ধ জাতীয় খাবার, মাছেও হরমোন ব্যবহার ও এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, শাক-সবজিতে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না। তবে কীটনাশক দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এখনকার অধিকাংশ পশুখাদ্যে, গো-খাদ্যে, পোল্ট্রি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। আর এসব প্রাণীর দেহে এভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকা অবস্থায় সেগুলোর মাংস খাচ্ছি আমরা। এসব খাদ্যে উচ্চ মাত্রার মার্কারি ও ক্রোমিয়ামও থাকে। এভাবে তা মানবদেহে চলে যাচ্ছে। এমনকি মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে তা বাচ্চার দেহেও যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয় তার অর্ধেকই ব্যবহৃত হয় পশু উৎপাদনে। আর মানুষের জন্য তা বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক বিশেষজ্ঞ একে 'নীরব মহামারী' হিসেবে মনে করছেন। কারণ এর প্রধান ঝুঁকি হলো, কোনো সংক্রমণ ছাড়া এতো বেশি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে পশুর শরীরে যে জীবাণু তা ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে। ফলে মানুষ যখন এভাবে উৎপাদিত গরু, মুরগী বা মাছ খায়, তখন খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে এসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু প্রবেশ করে। এরপর মানুষ যখন তার নিজের অসুখ হলে সেসব এন্টিবায়োটিক খায়, তখন সেই ওষুধ কাজ করে না।
বিএসএমএমইউ'র অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, খাবার উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। যেদিন মুরগী খাওয়া হবে তার ১৫ দিন আগে তার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে সেটি মানুষের শরীরে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না। এজন্য দরকার নজরদারি।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন প্রক্রিয়াতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার রোধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিলেও মূল কাজটি করতে হবে রাষ্ট্রকে। খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজারে বিক্রি করা খাদ্যদ্রব্যে যেন অ্যান্টিবায়োটিক না থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লুৎফুল কবির বলেন, পরিস্থিতি আতঙ্ক তৈরির মতো নয় আবার হেলাফেলা করাও যাবে না। তবে সচেতন হতে হবে। একটা সময় সরকারি পর্যায়ে ফরমালিন নিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন ফরমালিন নেই বললেই চলে। কারণ সেটি আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এভাবে খামারিরা যেসব স্থান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক সংগ্রহ করা হয় সেসব স্থানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর চাইলে এটা মনিটরিং করতে পারে। আর যেসব ব্যবসায়ী তাদের পালিত পশু-প্রাণীকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াচ্ছে তাদের সচেতন করতে হবে। সূত্র: বিবিসি