ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা ঠেকাতে মরিয়া ইসি

চট্টগ্রামে কড়াকড়ি

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশের নাগরিক না হয়েও রোহিঙ্গা নারী রমজান বিবি নিজেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর এলাকার বাসিন্দা দেখিয়ে লাকী নামে ভোটার হয়েছেন। ভুয়া নাম-ঠিকানা সংবলিত ওই রোহিঙ্গা নারীর জাতীয় পরিচয়পত্রটি (এনআইডি) দেখা যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারেও। যদিও নির্বাচন কমিশনের কাছে তার ভোটার হওয়ার কোনো কাগজপত্র সংরক্ষণে নেই। এ রকম অবৈধ উপায়ে অনেক রোহিঙ্গা হয়ে যাচ্ছেন এ দেশের ভোটার। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে কড়া অবস্থান নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় বাড়তি সতর্কতার নির্দেশনা দিয়ে ৯ উপজেলাকে 'বিশেষ এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব উপজেলায় ভোটার হতে হলে পূরণ করতে হবে বিশেষ তথ্য ফরম। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়া দেওয়া যাবে না ভোটার ফরমও। মাত্র কয়েকদিনে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রও। রোহিঙ্গা নারী লাকীর ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে অন্তত ৭৩টি ভুয়া এনআইডির তথ্য ইসির সার্ভারে থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এমন ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে এনআইডি সার্ভারের নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ নির্বাচন কমিশনের লোকজন ছাড়া সুরক্ষিত সার্ভারে এমন নিখুঁতভাবে ভুয়া তথ্য কারও পক্ষে আপলোড করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

'বিশেষ এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা উপজেলাগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে লাগোয়া কর্ণফুলী, আনোয়ারা, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'কোনো প্রকার কাগজপত্র ছাড়া সার্ভারে রোহিঙ্গা নাগরিকের ভোটার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হতে না পারে সেজন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিচরণের কারণে জেলার ৯ উপজেলাকে 'বিশেষ উপজেলা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি জানান, কাগজপত্রবিহীন সার্ভারে শনাক্ত হওয়া ভুয়া এনআইডিতে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, হাটহাজারী উপজেলাসহ নগরের কয়েকটি এলাকাকে ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব এলাকায় আমাদের বাড়তি নজর রয়েছে। তথ্য সংগ্রহকারীদের এসব বিষয়ে দেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান সমকালকে বলেন, 'রোহিঙ্গারা ভোটার হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে। রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে তাই বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তোলার সময় কারও পরিচয়, ঠিকানা, ভাষাসহ কোনো কিছু সামান্য সন্দেহ হলেই তাকে চ্যালেঞ্জ করা হবে। সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে বাড়ির জমির দলিলের কাগজপত্র, মা-বাবা, ভাইবোনসহ আত্মীয়-স্বজনের জাতীয় পরিচয়ত্রের কপি যাচাই-বাছাই করা হবে।'

এবার গতবারের ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে বাদপড়াদের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির আগে যাদের জন্ম তারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। একই সঙ্গে ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারির আগে জন্ম নেওয়া নাগরিকদেরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কয়েকজন থানা নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, 'কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশংকা থাকায় চট্টগ্রামে স্থায়ী নয় এমন নাগরিকদের ক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র নেওয়া হবে। তথ্য সংগ্রহের সময় কিংবা ছবি তোলার সময় কাউকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই তাকে চ্যালেঞ্জ করা হবে।'

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ডকে ছয়টি থানায় ভাগ করে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কোতোয়ালি থানা এলাকার ওয়ার্ডগুলোতে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। ৫ অক্টোবর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে নিবন্ধন (ছবি তোলা) কার্যক্রম। পাঁচলাইশ থানার ওয়ার্ডগুলোতে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে তথ্য সংগ্রহ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে নিবন্ধন। ডবলমুরিং থানার ওয়ার্ডগুলোতে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে তথ্য সংগ্রহ। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে নিবন্ধন। চান্দগাঁও থানার ওয়ার্ডগুলোতে ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ এবং ৩০ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে নিবন্ধন। পাহাড়তলী থানার ওয়ার্ডগুলোতে তথ্য সংগ্রহ চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। নিবন্ধন চলবে ৩ থেকে ১৮ নভেম্বর। বন্দর থানা এলাকার ওয়ার্ডগুলোতে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধন চলবে।