ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সীসার বিষক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যায় বাংলাদেশ চতুর্থ

সীসার বিষক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যায় বাংলাদেশ চতুর্থ
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০ | ০৬:৪৩ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০ | ০৭:০১

সীসা বিষক্রিয়ায় শিশুরা ব্যাপকভাবে ও পূর্বের অজানা মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিনজন শিশুর একজন বা প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। অর্থাৎ এই শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি, যা ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে চতুর্থ অবস্থানে নিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার ইউনিসেফের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি তোমো হোজুমি বলেন, সীসার বিষক্রিয়া শিশুদের জীবনভর শিক্ষাগ্রহণে অসামর্থ্য করে তোলাসহ তাদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং এর কারণে বড় হওয়ার পর তাদের আয়ের সক্ষমতাও প্রভাবিত হয়। বিপজ্জনক ধাতব বর্জ্য ও সীসার দূষণ এবং এর কারণে শিশুদের ক্ষতিজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করবে ইউনিসেফ।

‘দ্য টক্সিক ট্রুথ: চিলড্রেন্স এক্সপোজার টু লিড পলিউশন আন্ডারমিন্স এ জেনারেশন অব পোটেনশিয়াল’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি শিশুদের সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া বিষয়ক হেলথ মেট্রিক্স ইভাল্যুয়েশনের করা একটি বিশ্লেষণ এবং এটি এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারস্পেকটিভসে প্রকাশের জন্য অনুমোদিত একটি গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা হয়।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত বাতাসে এবং আবাসস্থলের কাছাকাছি এলাকায় ব্যবহৃত সীসা-এসিড ব্যাটারির অবৈধ পুনর্ব্যবহারকে সীসার সংস্পর্শে আসার একটি প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স ইভাল্যুয়েশনের তথ্য অনুসারে, সীসার বিষক্রিয়াজনিত কারণে বিশ্বে যেসব দেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, সেই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ এবং এ দেশের জনসংখ্যার প্রত্যেকের রক্তে সীসার উপস্থিতির গড় হার ৬.৮৩ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার, যা সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বিশ্বে ১১তম।

এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে মশলায় উচ্চ মাত্রায় সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হলুদের মান নির্দেশক হিসেবে রঙ ও ওজন বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত লেড ক্রোমেট শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমানভাবে রক্তে সীসার মাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। এক সমীক্ষা অনুসারে, কিছু পণ্যে সীসার উপস্থিতি জাতীয় সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে ৫০০ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীসার ভূমিকাজনিত কারণে বাংলাদেশে আইকিউ হ্রাস পাওয়ায় অর্থনৈতিক যে ক্ষতি হয় তা দেশের জিডিপির ৫.৯ শতাংশের সমান। সীসার বিষক্রিয়া শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের সক্ষমতাকে ব্যহত করে এবং জীবনে পাওয়া সুযোগগুলোর সর্বাধিক সুবিধা গ্রহণে তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, প্রথম দিকে অল্প কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও সীসা নীরবে শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে মৃত্যুর মতো পরিণতিও ডেকে আনে। সীসার দূষণ কতটা বিস্তৃত তা জানা এবং ব্যক্তি বিশেষ ও কমিউনিটিতে এটি যে ক্ষতি করে তা বুঝতে পারা শিশুদের সুরক্ষা প্রদানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণকে অবশ্যই অনুপ্রাণিত করবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সীসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন যা শিশুদের মস্তিষ্কে অপূরণীয় ক্ষতি করে। এটি বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনে, কারণ এটি তাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই এর ক্ষতি করে, যার ফলস্বরূপ তাদেরকে সারা জীবনের জন্য স্নায়বিক, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।

শৈশবকালীন সীসাজনিত বিষক্রিয়া মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত সমস্যা এবং অপরাধ ও সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় শিশুরা পরবর্তী জীবনে কিডনি নষ্ট হওয়ার এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিসহ ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করে।

শৈশবকালীন সীসাজনিত বিষক্রিয়ার শিকার হওয়া শিশুদের জীবনভর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে সীসাজনিত বিষক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা রাখে সীসা-এসিড ব্যাটারিগুলোর অনানুষ্ঠানিক ও নিম্নমানের পুনর্ব্যবহার, যা ২০০০ সালের পর থেকে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যানবাহনের মালিকানা বৃদ্ধির পাশাপাশি গাড়ির ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বিষয়ক নিয়মকানুন ও অবকাঠামোগত ঘাটতি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ শতাংশ সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি অনিরাপদভাবে পুনর্ব্যবহারে ভূমিকা রাখে।

বিপজ্জনক এবং প্রায় অবৈধ পুনর্ব্যবহারমূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীরা ব্যাটারির খোলশ ভেঙে একে উন্মুক্ত করেন, যার কারণে অ্যাসিড ও সীসার ধূলিকণা মাটিতে পড়ে এবং তারা অপরিশোধিত সীসা উন্মুক্ত চুল্লিতে গলান  যা থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয় যা আশপাশের কমিউনিটিতে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দেয়। সীসা যে একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন সে সম্পর্কে প্রায়ই কর্মী এবং সংস্পর্শে থাকা কমিউনিটি সচেতন নয়।

শৈশবে সীসার সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে অন্যান্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে সীসাযুক্ত পাইপের ব্যবহারের ফলে পানিতে থাকা সীসা; সক্রিয় শিল্প থেকে আসা সীসা - যেমন খনি এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারযোগ্যকরণ; সীসাভিত্তিক র‌ঙ ও রঞ্জক পদার্থ; সীসাযুক্ত গ্যাসোলিন, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যথেষ্ট মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে, তবে ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উৎস হিসেবে রয়ে গেছে; খাবারের ক্যানে সীসার ঝালাই এবং মশলা, কসমেটিকস, আয়ুর্বেদিক ওষুধ, খেলনা এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যে সীসার উপস্থিতি। যেসব বাবা-মায়ের পেশা সীসা নিয়ে কাজ করার সঙ্গে সম্পর্কিত তারা প্রায়ই তাদের পোশাক, চুল, হাত ও জুতার মাধ্যমে সীসামিশ্রতি ধূলা নিয়ে আসেন এবং এতে করে অজান্তেই তাদের শিশুরা বিষাক্ত এই উপাদানের সংস্পর্শে আসে।

পিওর আর্থের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ফুলার বলেন, ভালো খবর হচ্ছে-কর্মী, তাদের সন্তান এবং আশপাশের বাসিন্দারা সীসার সংস্পর্শে আসা ছাড়াই নিরাপদে সীসা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা যায়। সীসা দ্বারা দূষিত স্থানগুলো ঠিক করে ফেলা এবং পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব। সীসার বিপদ সম্পর্কে লোকজনকে জানানো এবং ক্ষমতায়িত করা যেতে পারে, যাতে তারা নিজেদের এবং তাদের সন্তানদের রক্ষা করতে পারে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ থেকে ব্যাপক মাত্রায় মুনাফা হয়: উন্নত স্বাস্থ্য, বর্ধিত উৎপাদনশীলতা, উচ্চ আইকিউ, কম সহিংসতা এবং বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যত।

সীসাযুক্ত জ্বালানি তেল এবং বেশিরভাগ সীসাযুক্ত রঙের ব্যবহার বন্ধ করার পর থেকে উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে রক্তে সীসার মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে, তবে নিম্ন ও মধ্য-আয়ের দেশগুলোতে শিশুদের রক্তে উচ্চমাত্রায় সীসার উপস্থিতি বজায় রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা বিপজ্জনক মাত্রায় বেশি, এমনকি বৈশ্বিকভাবে সীসাযুক্ত জ্বালানি তেলের ব্যবহার বন্ধের এক দশক পরেও।

প্রতিবেদনে পাঁচটি দেশের কেস স্টাডি রয়েছে যেখানে সীসা দূষণ এবং অন্যান্য বিষাক্ত ভারী ধাতব বর্জ্য শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে-বাংলাদেশের কাঠগোরা; জর্জিয়ার তিবিলিসি; ঘানার অ্যাগবোগব্লোশি; ইন্দোনেশিয়ার পেসারিয়ান; এবং মেক্সিকোর মোরেলস স্টেট।

আরও পড়ুন

×