সিরিজ বোমা হামলার ১৫ বছর

সাক্ষী হাজির করা যাচ্ছে না, ঝুলে আছে ৪৭ মামলা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সালেহ রনি

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেশের ৬৩ জেলায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এসব হামলায় দু'জন বিচারক নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। পরে ঢাকায় ১৮টিসহ সারাদেশে করা হয় মোট ১৫৯টি মামলা। তবে এর মধ্যে ৪৭টি মামলা ১৫ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় আদালতে ঝুলে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা। তারা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক মামলায় এখন সাক্ষী খুঁজে পাওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবশ্য চাঞ্চল্যকর এই মামলাগুলোর বিচার দেরিতে হলেও শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি সমকালকে বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সরকার বদ্ধপরিকর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এই সরকার করেছে। তিনি আরও বলেন, চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল রয়েছে। তারা সাক্ষী হাজিরসহ বিচারের নানা সংকট নিরসনে সচেষ্ট। যত সময় লাগুক বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশব্যাপী পরিচালিত সিরিজ বোমা হামলার বিচারও হবে।

সেদিন মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাড়া দেশের সব জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে আত্মপ্রকাশ করে জেএমবি। জঙ্গি হামলায় ওই বছরের ১৭ নভেম্বর ঝালকাঠিতে দুই বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদ নিহত এবং কয়েকশ' মানুষ আহত হন। আজ সিরিজ বোমা হামলার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। জেএমবি তখন এ ঘটনার দায় স্বীকার করে লিফলেটও বিতরণ করে। ফলে সারাদেশে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার তৈরি হয়। চাঞ্চল্যকর ওই বোমা হামলার ঘটনায় চার্জশিটভুক্ত জঙ্গিদের অনেকে এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। তবে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কিংবা কারাগারে থাকায় দুর্বল হয়ে পড়েছে জঙ্গি সংগঠনটি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিরিজ বোমা হামলার পর করা মামলার মধ্যে ৯৬টির বিচার শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ১৬টি মামলা বিভিন্ন সময়ে আদালত থেকে খারিজ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৪৩টি মামলায় চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। মামলাগুলোতে মোট আসামি এক হাজার ১০৬ জন। এর মধ্যে ৯৮৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় আসামিদের অনেকেই এখন পলাতক। বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেও ইতোমধ্যে হাইকোর্টে আপিল করেছে আসামিরা। অবশ্য ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় ২০০৭ সালের মার্চে জেএমবিপ্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাক্ষী হাজিরে রাষ্ট্রপক্ষের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই ৪৭টি মামলার বিচারকাজ এখনও শেষ হয়নি। আদালত থেকে সাক্ষীদের বারবার হাজির হওয়ার সমন দিলেও তা ফেরত আসছে। কারণ বেশিরভাগ সাক্ষীই আদালতের নথিতে উল্লেখিত ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, সাক্ষীদের মধ্যে অনেকে ভীতির মধ্যে রয়েছেন।

জানা গেছে, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সর্বোচ্চ ২৩টি মামলা হয় ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জে। সর্বনিম্ন তিনটি করে মামলা হয় খুলনা মহানগর ও রেলওয়ে রেঞ্জে। মহানগরীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় ঢাকা মহানগর এলাকায় অর্থাৎ, ডিএমপিতে। এখানে ১৮টি মামলা হলেও ৯টি মামলায় পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে। এসব মামলার চূড়ান্ত রায়ে ফাঁসি কার্যকর হয় ৯ আসামির। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেও শতাধিক জঙ্গির করা আপিল বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির সমকালকে বলেন, কারোনার আগে অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারিতেও হাইকোর্টে জঙ্গিদের করা ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হয়েছে। অনেক আসামির জামিনের আবেদন এবং বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন। তবে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সচেষ্ট রয়েছে। তিনি জানান, জঙ্গি ও নাশকতা-সংক্রান্ত মামলাগুলো রাষ্ট্রপক্ষ সব সময় মনিটর করে থাকে।

বিচারিক আদালতে এখনও ৪৭টি মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু সমকালকে বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অর্থাৎ, পুলিশ যথাসময়ে আদালতে সাক্ষী হাজির করতে পারেননি। আদালত বারবার সময় দিলেও সাক্ষী খুঁজে পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন তারা। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।