ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনুষদের মতামত না নিয়েই বাতিল করার সিদ্ধান্ত!

অনুষদের মতামত না নিয়েই বাতিল করার সিদ্ধান্ত!
×

ফাইল ছবি

মাজহারুল ইসলাম রবিন

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১১:২৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত 'ঘ' ইউনিট বাতিল করার কথা চলছিল ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে। শেষ পর্যন্ত গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ভর্তি কমিটির বিশেষ সভায় এই ইউনিট তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা। তবে অভিযোগ উঠেছে, অনুষদের মতামত না নিয়েই ইউনিটটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের যে ডিনস কমিটির সভার আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাতিলের সিদ্ধান্ত এসেছে বলে জানানো হয়েছে, সেই সভায়ও এ বিষয়ে মতৈক্য হয়নি বলে জানিয়েছেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীরাও চাচ্ছেন ইউনিটটি বহাল থাকুক। সোম ও মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। তারা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী নিজ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ভালো ফল করতে ব্যর্থ হলেও 'ঘ' ইউনিটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। 'ঘ' ইউনিট বাতিল করলে তারা আর সেই সুযোগ পাবেন না। এসব ভর্তিচ্ছুর কথা বিবেচনা করে ইউনিটটি বহাল রাখা উচিত।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ওই সময়ের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম সমকালকে বলেন, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর ডিনস কমিটির সভার বিষয়ে আমাকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই সভায় আমি এ ধরনের বক্তব্য দিইনি। সভার শেষ দিকে এটা আলোচ্য বিষয় হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছিল। তখন আমি এত তাড়াতাড়ি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে অভিমত দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, অনুষদের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে মতামত জানানো হবে। আমি সভায় 'ঘ' ইউনিট রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলাম।
ড. সাদেকা হালিম বলেন, ৮ নভেম্বরের পর আমরা ফ্যাকাল্টির সভা করেছি। সেখানে শিক্ষকরা 'ঘ' ইউনিট বাতিল না করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু ২৩ নভেম্বর ভর্তি কমিটির সভায় যে সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। পুরো ভর্তি কমিটির সামনে আমি বলেছি, আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তখন যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এ কথা আমাদের কাউকে জানানো হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) তখন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, 'ঘ' ও 'চ' ইউনিট বাতিল হয়নি, সংস্কার করা হবে।
এখন কেন বলা হচ্ছে 'চ' ইউনিট নিয়ে কোনো কথাই হয়নি, শুধু 'ঘ' ইউনিট বাতিল?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ সমকালকে বলেন, 'ঘ' ইউনিট বাতিলের সিদ্ধান্ত একেবারে অযৌক্তিক। আমি এসএসসি ও এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ছিলাম। পরবর্তীতে এই ইউনিটের মাধ্যমে অন্য বিভাগে ভর্তি হতে পেরেছি। আমার মতো যেসব শিক্ষার্থী বিভাগ বা ইউনিট পরিবর্তন করতে চায়, 'ঘ' ইউনিট বাতিল হলে সেই পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম খান বলেন, 'ঘ' ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা নিতে হলে প্রশাসনকে অনেক ব্যবস্থা নিতে হয়। কোনো শিক্ষার্থী নিজের ইউনিটে সুযোগ না পেলে 'ঘ' ইউনিটে পরীক্ষা দেয়। অর্থাৎ একই শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক ব্যয় ও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। 'ঘ' ইউনিট বাতিল হলে এটি থাকবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিজ ইউনিটের বাইরে অন্য ইউনিটের বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
'ঘ' ইউনিট বাতিলের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আত্মঘাতী বলে মনে করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সজীব। তিনি বলেন, এক ইউনিটের শিক্ষার্থী অন্য ইউনিটে পড়াশোনা করতে পারবে না কেন? অনেক শিক্ষার্থী সমাজ ও পরিবারের চাপে পড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসএসসি ও এইচএসসিতে বিজ্ঞান কিংবা বাণিজ্য বিভাগে পড়েন। কিন্তু তাদের হয়তো ইচ্ছা ছিল সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কোনো বিভাগে পড়া। 'ঘ' ইউনিটের মাধ্যমে তা সম্ভব হতো। এই ইউনিট বন্ধ হয়ে গেলে সেই পথ অনেক সংকুচিত হবে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মানজুর হোসাইন মাহি বলেন, বিভিন্ন কারণে বিজ্ঞান কিংবা বাণিজ্য বিভাগের পড়াশোনার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অনেকে 'ঘ' ইউনিটের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেত। এই ইউনিট বাতিল হয়ে গেলে অনেকের উচ্চশিক্ষার দ্বার বন্ধ হয়ে যাবে। শুনেছি, 'ঘ' ইউনিটের মাধ্যমে যারা অন্য বিভাগে ভর্তি হতে চান, তাদের অন্যভাবে নেওয়া হবে। তবে সেটা কীভাবে হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা কমানো মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং যৌক্তিকতার আলোকে আসন নির্ধারণই মূল বিষয়। এই অনুযায়ী কোনো বিভাগে আসন বেড়েছে, কোথাও বা কমেছে। অন্যদিকে, 'ঘ' ইউনিট না থেকে বরং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ নিয়ে সমন্বিত একটা ইউনিট হবে। এ ছাড়া বিজ্ঞান সম্পর্কিত সব অনুষদ নিয়ে একটা ইউনিট এবং বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে আরেকটা ইউনিট হবে। এটি আগেরই সিদ্ধান্ত। কীভাবে ভর্তিচ্ছুরা নিজ ইউনিটের বাইরে অন্য ইউনিটে যেতে পারবেন, এই বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নে ডিনস সাব-কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।



আরও পড়ুন

×