দিনভর বৈঠক
সমঝোতা সম্ভব কিনা প্রশ্ন কংগ্রেসম্যানদের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকা সফররত দুই মার্কিন কংগ্রেসম্যান বৈঠক করেন - পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৩ | ২১:২৮
বাংলাদেশ সফরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের দুই কংগ্রেসম্যান গতকাল রোববার দিনভর বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। তাদের সফরের মূল উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়ন যাচাই হলেও এসব বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন। কংগ্রেসম্যানরা জানতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা সম্ভব কিনা।
সকালে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস পরিদর্শনের মাধ্যমে দিন শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের কংগ্রেসম্যান এড কেইস ও বিরোধী রিপাবলিকান দলের রিক ম্যাকরমিক। পরে তারা রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।
দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের গুলশানের বাসভবনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একসঙ্গে বৈঠক করেন দুই কংগ্রেসম্যান। এরপর তারা সুশীল সমাজের ১৬ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন।
নির্বাচন নিয়ে বড় দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলে একাধিক বৈঠকে বলা হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, কংগ্রেসম্যানরা চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে বেশি জোর দিয়েছেন; নিজেদের মতামত কমই প্রকাশ করেছেন। তাদের জোর ছিল দুই দলের সমঝোতা সম্ভব কিনা, তা জানা। তবে তারা জাতিসংঘকে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে ডাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা আরও বলেছেন, বাংলাদেশের এমন নির্বাচন করা উচিত, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে।
‘কংগ্রেসম্যানরা আসায় আ’লীগ খুশি’
পিটার হাসের বাসভবনে বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করা নাহিম রাজ্জাক এমপি সমকালকে বলেন, ভূ-রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। কংগ্রেসম্যানরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কীভাবে যাবেন, কী কী পরিদর্শন করবেন– সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাহিম রাজ্জাক বলেন, বিএনপির শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী কথা তুলেছিলেন। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা এ বিষয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাননি। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চান। এ বিষয়ে সরকার আন্তরিক। যত পর্যবেক্ষকই আসুক, আওয়ামী লীগের সমস্যা নেই। কংগ্রেসম্যানরা বাংলাদেশে আসায় আওয়ামী লীগ খুশি। ভবিষ্যতে যেন আরও বিদেশি প্রতিনিধি সফরে আসেন, সরকার তা নিশ্চিত করবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিরা সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, নির্দলীয় বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের সুযোগ নেই।
তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে ‘ব্যাপক আলোচনা’ বিএনপির
বৈঠকের পর বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং নির্বাচন নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলেছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিএনপি প্রতিনিধি বলেছেন, আওয়ামী লীগের অধীনে গত দুই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। বিরোধী মত দমন করতে সরকার মিথ্যা, গায়েবি মামলা দিয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে রেখেছে। মানবাধিকার হরণে বিচার বিভাগকেও ব্যবহার করছে।
আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিরা সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতার কথা বললে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী পাল্টা বলেন, কীসের সংবিধান! আওয়ামী লীগ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে সংবিধান পাল্টে অন্যদের ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। বিএনপি ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ফেরাতে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করছে।
কীভাবে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণ করা যাবে– কংগ্রেসম্যানদের এ প্রশ্নে বিএনপি নেতা এ্যানী বলেন, সরকার পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনই উপায়।
নির্বাচন যেন ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’ পায়
বৈঠকে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টির এমপি মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল সমকালকে বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। কংগ্রেসম্যানরা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থেই নির্বাচন এমন হওয়া উচিত, যা আন্তর্জাতিকভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।’
সম্প্রতি ১৪ মার্কিন কংগ্রেসম্যান জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনে জাতিসংঘের ভূমিকা চেয়েছেন। রানা মোহাম্মদ সোহেল সমকালকে জানান, দুই মার্কিন কংগ্রেসম্যানও জাতিসংঘের প্রসঙ্গ টানেন। তারা বলেছেন, ‘অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য বাংলাদেশ চাইলে পর্যবেক্ষক হিসেবে জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। তবে আমন্ত্রণ জানাবে কিনা, তা বাংলাদেশের বিষয়।’
জাপার এই এমপির ভাষ্য, তিনি বৈঠকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের জন্য সংলাপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ চীনের বলয়ে যাচ্ছে– মন্তব্য কংগ্রেসম্যানদের
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, বাংলাদেশ চীনের বলয়ে চলে যাচ্ছে– এমন বক্তব্য মার্কিন কংগ্রেসম্যানের কাছে শুনেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে মন্ত্রী বলেছেন, ‘চীন নিয়ে বলেছে, তোমরা চীনের ভেতরে চলে যাচ্ছ।’ আমরা বলেছি, ‘জি না। আমরা চীনের ঋণের ফাঁদেও যাচ্ছি না।’
কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভিন্নতা বৈঠকে তুলে ধরেছেন বলে জানান ড. মোমেন। তিনি বলেছেন, মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা অবাধ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ধারণা দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের গোলাম হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ভয়ংকর জায়গা, পুলিশ লোক ধরে ফেলছে, যখন-তখন রাস্তাঘাটে লোক মরছে– এ ধরনের ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই সফরে তাদের সেই ধারণা দূর হবে বলে দাবি মন্ত্রীর।
চীনের আধিপত্য ঠেকাতে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বহুল আলোচিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘চীনবিরোধী’ জোট কোয়াডে বাংলাদেশকে চায়। চীন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, কোয়াডে যোগ দিলে সম্পর্কের ক্ষতি হবে। ড. মোমেন জানান, ইন্দো-প্যাসিফিক সম্পর্কে বাংলাদেশের অভিমত– সবার সমৃদ্ধির জন্য অবাধ, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ নৌযান চলাচল প্রয়োজন।
সমঝোতার পথ আছে কিনা
নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতার পথ আছে কিনা– জানতে চেয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা। এ তথ্য জানিয়ে ড. মোমেন বলেছেন, বিএনপির দাবি, সরকার পতনের পর তারা নির্বাচনে আসবে। এতে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন, যুক্তরাষ্ট্রে কি সরকার পতন হয় নির্বাচনের সময়? এমন দাবি উঠলে মার্কিন সরকার কি আলোচনায় বসবে?
ড. মোমেন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগ চায়, তাতে সবাই অংশগ্রহণ করুক। কে জয়ী হবে, তা জনগণের ওপর নির্ভর করবে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, অনেক ভালো কাজ করায় জনগণ ভোট দেবে। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়।
ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ও বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির দুই আইনপ্রণেতা একসঙ্গে এসেছেন বাংলাদেশে। ড. মোমেন জানান, তারা নিজেদের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সব সময় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করি।’ এর জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বলেছেন, বাংলাদেশে ঐকমত্য করার মতো দাবি-দাওয়া কারও কাছে নেই। আওয়ামী লীগ চায়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বিএনপি নির্বাচনের খবরই রাখে না। সরকার পতন সংলাপের বিষয়বস্তু হতে পারে না। সংলাপের কোনো ‘ফর্মুলা’ মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা দেননি বলে জানান মন্ত্রী।
সহিংসতামুক্ত ভোটের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের ভূমিকা রয়েছে বলে বৈঠকে জানান ড. মোমেন। তিনি বলেন, গত কয়েকটি নির্বাচন ভালো হয়েছে, সহিংসতা হয়নি। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করতে সবার আন্তরিকতা দরকার।
ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে কংগ্রেসম্যানদের আহ্বান জানানোর কথা জানান ড. মোমেন। তিনি বলেছেন, দুই দেশের বাণিজ্য ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং তা বাড়ছে; কিন্তু মার্কিন বিনিয়োগ আসছে না। আগে অনেক বেশি আসত।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী, কাজী নাবিল আহমেদ, মোহাম্মদ এ আরাফাত, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সুশীল সমাজের ভাষ্য
কংগ্রেসম্যানরা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চা-চক্রে যোগ দেন। এতে অংশ নেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল প্রমুখ।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কংগ্রেসম্যান ছাড়াও অনেকে ছিলেন। তারা বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশসহ সব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তারা জানতে এসেছেন; অনেক প্রশ্ন করেছেন। তারা নিজেদের কথা বলেননি। শুধু শুনতে চেয়েছেন।
রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে কী কথা হয়েছে– জানতে চাইলে বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সরকারের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, তা বলেছেন। তবে ভোটাধিকার ও মানবাধিকার সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে; বাইরের কেউ করতে পারবে না।
আজ রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর
রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কতটা যৌক্তিক হচ্ছে, তা যাচাই করতে আজ সোমবার কংগ্রেসম্যানরা কক্সবাজারে যাবেন। সেখানে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন (আরআরআরসি), জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবেন। আগামীকাল মঙ্গলবার তাদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
- বিষয় :
- কংগ্রেসম্যান