কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার জনসমুদ্র
সরকার পদত্যাগের এক দফা
সারাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল, সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করে দুপুরের পর থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী, সমর্থকসহ নানা শ্রেণি- পেশার মানুষ জড়ো হন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বিকেলে সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ছবি: মাহবুব হোসেন নবীন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪ | ০২:১০ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৪ | ০৯:২১
আর ৯ দফা নয়, এবার সরকার পতনের এক দফা দাবিতে এসে ঠেকেছে ছাত্র আন্দোলন। এই এক দফা বাস্তবায়নে আজ রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পাদদেশে জনসমুদ্রে এ ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।
এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শুধু শিক্ষার্থী নয়, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে। একসময় ওই এলাকা রূপ নেয় জনস্রোতে। ছাত্র-জনতার জমায়েতের ব্যাপ্তি একদিকে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল, অন্যদিকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। নানা স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ। ‘দফা এক, দাবি এক– শেখ হাসিনার পদত্যাগ’, ‘৯ দফা বাদ দে, এক দফার ডাক দে’, ‘দফা এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’– এ রকম প্রতিবাদী স্লোগান আন্দোলনকারীর কণ্ঠে শোনা যায়। এদিকে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ঘিরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, গাজীপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে জাকির হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রী ও সিটি মেয়রের বাসায় হামলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসা ও কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিনসহ চার বিএনপি নেতার বাসায় হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সকালে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরা, রামপুরা, মিরপুর, শান্তিনগর, আফতাবনগর, প্রগতি সরণি, বাড্ডা, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীরা জড়ো হন। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীর সঙ্গে অভিভাবকরাও ছিলেন। ঢাকার অনেক এলাকায় পুলিশকে সতর্ক অবস্থায় দেখা গেলে কোথাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়নি।
এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তরফ থেকে গতকাল বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনার এলাকা ছাড়ে। এর পর একটি অংশ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়। আরেকটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরে রাত সাড়ে ৭টার দিকে তারা ওই এলাকা ছাড়েন।
শহীদ মিনারের জমায়েত থেকে বিকেল ৫টার দিকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, খুব দ্রুতই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের জন্য সর্বস্তরের জনতা, ছাত্র সংগঠন ও সব পেশাজীবী নিয়ে সম্মিলিত মোর্চা ঘোষণা করা হবে। সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় রূপরেখা সবার সামনে হাজির করা হবে। শুধু শেখ হাসিনা নয়, মন্ত্রিসভাসহ পুরো সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এ সরকার মানুষ খুন করেছে, এখন সে লাশও গুম করেছে। যারা খুন করেছে, তারা খুনের বিচার করবে না, প্রত্যাশাও করি না। একদিকে নির্যাতন-নিপীড়ন, অন্যদিকে সংলাপের আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
আন্দোলনের এ সমন্বয়ক বলেন, ‘আজ আমরা জানি জনগণের দাবি কী। সবাই জানে, দফা এক, দাবি এক। আমাদের জন্য এ জনগণ নেমেছিল, জনগণকে মুক্ত করতে আমরা এখানে এসেছি।’
নাহিদ বলেন, ‘আমরা জীবনের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এক দফার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এ জায়গায় এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকার অধিকার থাকে না। শেখ হাসিনা বলেছেন, গণভবনের দরজা খোলা আছে। আমরা সাধুবাদ জানাই, তিনি আগে বুঝতে পেরেছেন গণভবনের দরজা খোলা রাখতে হবে। কারণ, তাঁর যাওয়ার সময় হয়েছে। আপনি দরজা খুলে অপেক্ষা করুন, আমরা আপনাকে উৎখাত করার জন্য আসব।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করতে চাই, যেখানে আর কখনও কোনো ধরনের ফ্যাসিজম স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসবে না। সব রাজবন্দির মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রয়োজনে জেলমুক্তি করে আমাদের ভাইদের নিয়ে আসব।’
নাহিদ বলেন, ‘জনগণকে আহ্বান করছি, স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র নাগরিকের অভ্যুত্থানে যোগ দিন। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সংগঠিত হন। যদি কোনোভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, কোনোভাবে কারফিউ জরুরি অবস্থা দেওয়া হয়, আমরা আজকে বলে দিচ্ছি, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা প্রয়োজনে গণভবন ঘেরাও করে আপনাকে উৎখাত করব।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা সবার কাছে আহ্বান থাকবে– জনগণ যদি সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে, সরকার যদি জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায়, তাদের হুকুম মানতে আপনারা বাধ্য নন।
আমরা এক দফায় সরকার এবং ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিলোপ ঘোষণা করছি। এর জন্য ছাত্র নাগরিকের অভ্যুত্থান আহ্বান করছি।
এর আগে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে আন্দোলনকারীদের সামনে আসেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ। আন্দোলনকারীরা তাঁকে ‘লিডার লিডার’ বলে স্বাগত জানান। সোয়া ৫টার দিকে আন্দোলনকারীদের বন্ধু বলে সম্বোধন করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে প্রায় ১৩ মিনিট বক্তব্য দেন।
এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি আজ বেলা ১১টা থেকে রাজধানীসহ সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সকাল থেকেই ঢাকার সব প্রবেশপথে ছাত্র-জনতাকে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্দোলনের নেতারা বলেছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে শাহবাগে বেলা ১১টা থেকে বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ হবে। কর্মসূচি সফল করতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করব। তবে আঘাত এলে তা প্রতিহত করার সব প্রস্তুতি রাখার আহ্বান রইল।
শহীদ মিনারে মানুষ আর মানুষ
সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উপস্থিতি। শহীদ মিনারের পাদদেশে অবস্থান নিয়ে তারা দাবিসংবলিত বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। কারও কারও হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যেই তারা বিক্ষোভ করতে থাকেন। দুপুর ২টার পর বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা এসে যোগ দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আসতে থাকেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করেন আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, মাহিন সরকার, আবু বাকের মজুমদার প্রমুখ। সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রুহুল আমিন, কানাডাপ্রবাসী অধ্যাপক কাজী জহিরুল ইসলাম, আইনজীবী মানজুর আল মতিন ও অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন।
দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ মিনারের সামনের সড়কে অবস্থান নেন একদল রিকশাচালক। তারা রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের দাবিতে কণ্ঠ মেলান। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এসে তাদের স্লোগানে নেতৃত্ব দেন। একক বা দলীয়ভাবে অভিভাবকদেরও আসতে দেখা যায়। তারা জানান, সন্তানদের ন্যায়সংগত আন্দোলনে সংহতি জানাতে এসেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারাও রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন।
আক্ষরিক অর্থেই সমাবেশস্থলে যেন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। শহীদ মিনারের সামনে ও পাশের সড়ক থেকে শুরু করে দোয়েল চত্বর এবং শেখ রাসেল টাওয়ার পর্যন্ত সড়ক ছিল বিভিন্ন বয়সের মানুষের স্লোগানে মুখর।
এদিকে শহীদ মিনার এলাকায় আন্দোলনকারীর মধ্যে বিনামূল্যে পানি ও খাবার বিতরণ করতেও দেখা যায়। নূর নাহার নামে এক নারী জানান, এমনিতে তিনি এ এলাকায় পানি বিক্রি করেন। এখন তিনি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যেই পানি দিচ্ছেন। আমড়া-পেয়ারা কেটে বিক্রি করা সুমন মিয়াও জানান একই কথা। মধ্যবয়সী আরেক ব্যক্তি পানির বোতল বিতরণ করছিলেন। তবে তিনি নিজের পরিচয় জানাতে চাননি।
গতকাল সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ থানা অতিক্রম করার সময় ‘ভুয়া ভুয়া’, ‘খুনি খুনি’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একটি গ্রুপ মানবঢাল বানিয়ে থানা আক্রমণ করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় পুলিশ থানার ভেতরে এবং বিজিবি সদস্যরা জাতীয় জাদুঘরের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে চলে যান।
সায়েন্স ল্যাবে মিছিল, সঙ্গে অভিভাবক
বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন আশপাশে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও দেখা গেছে। সায়েন্স ল্যাব মোড় ঘিরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ থাকলেও অবরোধকারীদের বাধা দেয়নি। বরং দূরত্ব বজায় রাখে। বিভিন্ন মার্কেটের সামনে ফুটপাতে অবস্থান নেয়।
অবরোধে শাহবাগ থেকে ধানমন্ডিমুখী এবং মিরপুর সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে যান চলাচল ছিল হাতেগোনা। নিউমার্কেট এলাকার দোকানগুলোর সামনে উৎসুক জনতার জটলা দেখা যায়। তাদের অনেকেই আন্দোলনকারীদের মিছিল যাওয়ার সময় হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের অধ্যাপক আহমেদ আবিদ বলেন, এক দফা, না ৯ দফা তা ছাত্রদের বিষয়। আমরা এসেছি আর কোনো ছাত্রের জন্য রক্ত না ঝরে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছি তাদের সুরক্ষায়। জিগাতলা থেকে আসা এক অভিভাবক মিরাজ হোসেন বলেন, কলেজপড়ুয়া মেয়ে বাসায় থাকতে চাইছে না। তাই নিজেও আসলাম।
একটি বাহিনীর কর্মকর্তা ও অভিভাবক বিক্ষোভে যোগ না দিয়ে ধানমন্ডি আড়ংয়ের সামনে ফুটপাতে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ছেলে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে। তার বন্ধুরা আক্রান্ত হয়েছিল, আহত হয়েছে। এর প্রতিবাদে ছেলে এসেছে। সঙ্গে আমাকেও আসতে হয়েছে।
বেলা ৩টার দিকে বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হয়। সে সময় মিছিলের সামনে থাকা কয়েকজন পুলিশকে সড়ক ছেড়ে ফুটপাতে চলে যেতে বলে। পুলিশ পথ ছেড়ে প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের সামনে চলে যায়। মিছিলকারীরা চলে গেলে সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধমুক্ত হয়।
রামপুরা-বাড্ডার পরিস্থিতি
কর্মসূচি সফল করতে মাঠে নামেন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের কর্মসূচিতে শিক্ষক, অভিভাবক ও মুক্তিযোদ্ধারা সংহতি প্রকাশ করেন। গতকাল সকাল ১১টায় ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কর্মসূচি থাকলেও আগে থেকেই জড়ো হতে থাকেন।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের লাল কাপড় মাথায় বেঁধে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। তবে গত কয়েক দিনের চেয়ে নমনীয় ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দুপুরের পর রামপুরা থেকে মিছিল নিয়ে মালিবাগ হয়ে শহীদ মিনারের দিকে যান আন্দোলকারীরা। এ সময় দেখা যায় বিটিভি ভবনের গেট বন্ধ করে ভেতরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। এদিকে মালিবাগের আবুল হোটেলের সামনে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিলেও পরে তারা সরে যান।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, নর্দান ও ইউআইইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন গুলশান কমার্স কলেজ, ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা উদ্যান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কুর্মিটোলা বিএফএ শাহীন কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।
কেমন ছিল উত্তরা
কোনো সহিংসতা না ঘটলেও রাজধানীর উত্তরায় ছিল টানটান উত্তেজনা। বিক্ষোভকারীরা গতকাল সকাল থেকেই উত্তরার বিএনএস টাওয়ারের পাশের সড়কে অবস্থান নেন। এর আগে থেকেই টাওয়ারের আশপাশে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ক্ষমতাসীন দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা। তারা টাওয়ারের পাশে আমির শপিং কমপ্লেক্সের সামনে সতর্ক অবস্থান নেন। কয়েকজনের হাতে ছিল লাঠি। মাথায় হেলমেট। তাদের মারমুখী ভঙ্গির কারণে বিক্ষোভকারীরা প্রধান সড়কে যেতে পারেননি। পাশের রাস্তায় মিছিল করে দুপুরের দিকে রোববার ফের জমায়েতের ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচির ইতি টানেন।
বিএনএস টাওয়ারের সামনেই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালনের কথা ছিল সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। পুলিশ ও সরকারি দলের দাপটের কারণে তারা তা করতে পারেননি।
গতকাল সকাল থেকেই উত্তরা এলাকায় ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিএনএস টাওয়ারের পেছনে উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে থাকেন। তারা প্ল্যাকার্ড নিয়ে সড়কে স্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর ১টার দিকে উত্তরা ৩ ও ৭ নম্বর সেক্টর থেকে আরও কয়েকশ শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিলে উত্তেজনা বাড়ে। তারা প্রধান সড়কে আসার চেষ্টা করেন। এ সময় সরকারি দলের সমর্থকদের তাদের মোকাবিলা করার জন্য লাঠি নিয়ে রাস্তায় প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। তাদের মারমুখী মনোভাবের কারণে আন্দোলনকারীরা সড়ক পর্যন্ত যেতে পারেননি।
এর আগে বিএনএস টাওয়ারের পাশে ছাউনি বানিয়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারীরা অবস্থান নেন। টাওয়ারের দু’পাশ ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের একক নিয়ন্ত্রণে। বিএনএস সেন্টারের পেছনের গলিতে দাঁড়ানো অভিভাবক হাসান বলেন, ‘আমরা এসেছি আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য। আমরা শান্তি চাই। আর একটা গুলিও নয়। এ গুলি আমাদের টাকায় কেনা।’ রাহাত নামে এক বিক্ষোভকারী জানান, দাবি মেনে নিলেই হবে না। লাশের হিসাব দিতে হবে। এই জবাব না পাওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্ধিত কমিটি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন করে ১৫৮ সদস্যের বর্ধিত সমন্বয়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের অফিসিয়াল টেলিগ্রাম গ্রুপে সমন্বয়ক রিফাত রশিদ এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্মমভাবে চালানো গণহত্যার বিচার, গণহত্যায় দায়ীদের পদত্যাগ এবং গ্রেপ্তারদের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৫৮ সদস্যের সমন্বয়ক টিম গঠন করা হলো। নতুন বর্ধিত এ কমিটিতে সমন্বয়ক হিসেবে ৪৯ জন এবং সহসমন্বয়ক হিসেবে ১০৯ জন শিক্ষার্থীকে পদায়ন করা হয়।
- বিষয় :
- কোটা আন্দোলন
- কোটা সংস্কার আন্দোলন