বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
তাপ বৃদ্ধিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ, ২১ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪৮
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ দ্রুতই বৈশ্বিক ‘হিট হটস্পট’-এর দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বে তাপমাত্রা বাড়ার হারে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এর প্রভাব শুধু পরিবেশে নয়, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপরেও ভয়াবহভাবে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের এবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে তা প্রায় ২১ হাজার কোটি। গরমের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগীও বেড়েছে।
‘অ্যান আনসাস্টেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালে সারাদেশে দুই ধাপে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি বড় জরিপও করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশন্স অফিসার এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক ইফফাত মাহমুদ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবেশের ইস্যু নয়, তা সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে আঘাত করছে।
জরিপে দেখা গেছে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে মানুষ গড়ে বছরে কিছুদিন তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। গ্রীষ্মকালে এই কাজ না করতে পারার হার ১ দশমিক ৪ দিন এবং শীতে ১ দশমিক ২ দিন। মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে কাজ হারানোর দিন তুলনামূলকভাবে বেশি শীতে, যা ১ দশমিক ৯ দিন এবং গ্রীষ্মে ২ দশমিক ৩ দিন। তবে গ্রাম ও শহর এলাকার মধ্যে তেমন পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
গড় হিসাবে দেখা গেছে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে পুরুষদের কাজ হারানোর হার নারীদের তুলনায় বেশি। বয়সভেদে ৩৬ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে কাজ হারানোর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তারা গ্রীষ্মে গড়ে ১ দশমিক ৭ দিন এবং শীতে ১ দশমিক ৪ দিন শারীরিক অসুস্থতায় কাজ হারিয়েছেন। মানসিক সমস্যার কারণে গ্রীষ্মে আড়াই দিন এবং শীতে দুদিন কাজ হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষের মধ্যে মৌসুমি পরিবর্তনে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মানুষ শারীরিক কারণে গ্রীষ্মে ১ দশমিক ১ দিন এবং মানসিক কারণে অতিরিক্ত ২ দশমিক ২ দিন কাজ হারিয়েছেন, যা শীতকালের চেয়ে বেশি।
অসংক্রামক রোগও নষ্ট করছে কর্মঘণ্টা
প্রতিবেদনে অসংক্রামক রোগও কাজ হারানোর বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হৃদরোগীদের গড়ে ৪ দশমিক ৭ দিন এবং ফুসফুসজনিত দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৩ দশমিক ৯ দিন অতিরিক্ত কাজ হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি সমস্যায় ভোগা মানুষও যথাক্রমে গড়ে ১ দশমিক ৯, ২ দশমিক ৫ এবং ১ দশমিক ৯ দিন অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, যারা বেশি সময় ঘরের ভেতরে কাটিয়েছেন, তারা বাইরে বেশি সময় কাটানো মানুষের চেয়ে গড়ে শূন্য দশমিক ১২ দিন কম কাজ হারিয়েছেন।
গরমে বাড়ছে রোগব্যাধি, স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়লেই বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক রোগের প্রকোপ। যেমন, দীর্ঘমেয়াদি কাশি। শীতে আক্রান্ত ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, গ্রীষ্মে এই রোগ বেড়ে যায় ৬ শতাংশে। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ঝুঁকি ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া গরমে তাপজনিত ক্লান্তিতে কর্মক্ষম মানুষ ও প্রবীণরা বেশি ভোগেন। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ঝুঁকি ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। গ্রীষ্মে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা শীতে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন নারী ও পাঁচ বছরের নিচের শিশু। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ঝুঁকি ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি থাকে। বিষণ্নতা গ্রীষ্মে দেখা যায় ২০ শতাংশ, শীতে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। উদ্বেগ বাড়ে গ্রীষ্মে ১০ শতাংশ, শীতে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বিষণ্নতা ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উদ্বেগ ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যায়।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ঢাকায়
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গরম ৯টি বছর। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল রাজধানী ঢাকায়। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সময়ে ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
অনুষ্ঠানে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, এই গবেষণা প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, তাপমাত্রা কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলছে। এটা জলবায়ু পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, যেসব দেশ বা গোষ্ঠী জলবায়ু সংকটে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তাদের তহবিল নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, বিশ্বের অনেক শহরে প্রবেশ করতেও ট্যাক্স দিতে হয়। অথচ আমাদের এখানে তাপমাত্রা থেকে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার সামান্য অংশ ব্যয় করলেই এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, উন্নয়ন মানেই সবুজ ধ্বংস– এ মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের উন্নয়ন ভাবনা পাল্টাতে হবে। ঢাকার আশপাশের বনগুলোকে নিরাপত্তা দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মন্ত্রী-এমপিকে প্লট দিতে গিয়ে যা ক্ষতি করার করে ফেলেছে, এখন সেটা বদলাতে হবে। তাঁর মতে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ভবন পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পূর্বাচলের সবুজ অংশ ধ্বংস হলে, সেখানে তাপমাত্রা কমানো অসম্ভব হয়ে যাবে।
সুপারিশ
এই সংকট উত্তরণে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে– জাতীয় প্রস্তুতি জোরদার করে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া, স্বাস্থ্য খাত প্রস্তুত করে হাসপাতাল ও জরুরি সেবায় গরম-সম্পর্কিত বিশেষায়িত ব্যবস্থা এবং প্রতিরোধমূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করা, গরমে সহনশীল আবাসন, ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তি, ছায়াযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করা, আবহাওয়ার তথ্য ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ নিয়ে সময়মতো সতর্কতা, পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত আবহাওয়া তথ্য দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নের পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বৈশ্বিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
- বিষয় :
- তাপমাত্রা