আলজাজিরার প্রতিবেদন
নতুন শাসনে পুরোনো পদ্ধতিতে খুন বিচারবহির্ভূত হত্যা অব্যাহত
১৪ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ৪০ জন
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির সময় অনেকে মনে করেছিলেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দিন শেষ হলো। এক বছরেরও বেশি সময় পর সেই বিশ্বাস এখন প্রশ্নের মুখে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১৪ মাসে (গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। গড়ে প্রতি মাসে তিনটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু সর্বশেষ প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ১১ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৯ জন বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ, ১৪ জন হেফাজতে নির্যাতন এবং সাতজন হেফাজতে পিটুনিতে নিহত হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের গুলি করা হয়েছে, হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে, অথবা পিটিয়ে মারা হয়েছে, যা আগের সরকারের সময়ের ভীতিকর পদ্ধতির কথা মনে করিয়ে দেয়। অধিকারের সঙ্গে যুক্ত মানবাধিকারকর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক ব্যক্তিরা, অভিযুক্ত অপরাধী এবং নিরাপত্তা অভিযানের সময় ধরা পড়া সাধারণ নাগরিকরা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে দায়মুক্তির চিহ্ন স্পষ্ট। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া আটক, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অস্বীকৃতি এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের অনুপস্থিতি ছিল।
ভোলায় গত বছরের আগস্টে চুরির অভিযোগে নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মারা যান বলে অভিযোগ ওঠে। তার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি।
বাংলাদেশি সাংবাদিক মওদুদ আহম্মদ সুজনের লেখা প্রতিবেদনটিতে সাম্প্রতিক সংঘটিত কয়েকটি বিচারবহির্ভূত হত্যার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরে পোশাক কারখানার শ্রমিক হাবিবুর রহমানকে চলতি বছর বিক্ষোভে পুলিশ গুলি করে। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার মৃত্যুর ঘটনায় কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
অধিকার বলেছে, বাংলাদেশ নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশন এবং এর ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুমোদন করেছে। এসব সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অধিকারের অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন পরিচালক তাসকিন ফাহমিনা আলজাজিরাকে বলেন, আগের শাসনামলের তুলনায় সংখ্যাটি কমেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। এর কারণ, যারা এখন নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজ করছেন, তারা পুরোনো ব্যবস্থার উত্তরাধিকার।
তবে তিনি গত জুলাইয়ের কথা উল্লেখ করেন। নিরাপত্তা বাহিনী গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। গুলিতে পাঁচজন নিহত হন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ধারাবাহিকতা। তাসকিন ফাহমিনা বলেন, ‘সেনাবাহিনী বেসামরিক আইন প্রয়োগের জন্য প্রশিক্ষিত নয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য মোতায়েন তাদের শৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করেছে।’
গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য ও অধিকারকর্মী নূর খান লিটন আলজাজিরাকে বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ধীরে বাড়ছে। এটা অপ্রত্যাশিত।’
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, সংস্কার বা নজরদারি ছাড়াই পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করে চলেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বাহিনী তুলে সেনা ক্যাম্প, র্যাব ক্যাম্প বা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে যুবদল নেতা আসিফ সিকদারকে জুলাইয়ে ঢাকার মিরপুর থেকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল অবৈধ অস্ত্র রাখার। তার পরিবার ও দল এই দাবিকে মিথ্যা বলেছে। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুসনদে ‘অজ্ঞান অবস্থায় আনা হয়’ কথাটি লেখা ছিল।
কুমিল্লার ইটলা গ্রামে যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলামকে (৪০) গত ৩১ জানুয়ারি ভোরে যৌথ বাহিনীর সাদা পোশাকের সদস্যরা আটক করেন। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে স্থানীয় হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখেন। স্থানীয়দের ক্ষোভের পর সেনা ক্যাম্প কমান্ডারকে প্রত্যাহার করা হয়।
এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী বলেন, ‘সেনাবাহিনী তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সাতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
জাতিসংঘের সুপারিশ উপেক্ষিত
২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন বা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর মাধ্যমে কমপক্ষে দুই হাজার ৫৯৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ছিল তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের একটি প্রধান কারণ।
গুম তদন্ত কমিশন শেখ হাসিনার আমলের এক হাজার ৭৫২টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। কমিশন জানায়, ভুক্তভোগী অনেককে গোপন আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। ৩৩০ জন এখনও নিখোঁজ। র্যাব, পুলিশ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দিত।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অন্তর্বর্তী সরকারকে র্যাব এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্তির সুপারিশ করে। ডিজিএফআইয়ের ক্ষমতা সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমিত করারও পরামর্শ দেয়। এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আগের সরকারের অধীনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তাও কাটেনি।
প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদরদপ্তর পদ্ধতিগত অপব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, হেফাজতে বা অভিযানে মৃত্যু নিয়ে তদন্ত হচ্ছে।
আলজাজিরা ড. ইউনূসের মিডিয়া উইংয়ের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েও পায়নি।
বিএনপির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলজাজিরাকে বলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারই কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর অপব্যবহারের বিষয়টি মোকাবিলা করতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহি ছাড়াই কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার, সংসদ এবং জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিলে জবাবদিহি ফিরে আসবে।
ইতিহাস বলছে, বাস্তবতা আরও জটিল। নূর খান লিটন বলেন, ‘আমরা ২০০৪ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দেখেছি।’ তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। তারা র্যাব গঠন করেছিল।
তাসকিন ফাহমিনা বলেন, প্রকৃত পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর। সংস্কার, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি– এর ওপর নির্ভর করবে দেশের ভবিষ্যৎ।
- বিষয় :
- হত্যা