ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে, বিদ্যুৎ সংকট কাটেনি

গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে, বিদ্যুৎ সংকট কাটেনি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:১৪

গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বিদ্যুৎ সংকট এখনও কাটেনি। বরং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতিও বেড়েছে। ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা একটি ইউনিট গতকাল রোববার দুপুরে ফের উৎপাদনে ফিরলেও একই দিনে কারিগরি ত্রুটিতে বাগেরহাটের রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। পটুয়াখালীর পায়রা ও আরএনপিএল কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এতে প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিড থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও জনজীবনে।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা ইউনিটটি মেরামত শেষে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। গত ৭ আগস্ট ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যায়। আর গত বুধবার রাতে একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন আরও কমে যায়। 

আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, একটি ইউনিটের বয়লারে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। গতকাল ভোরে মেরামতের কাজ শেষ করে ইউনিটটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। বেলা ২টার দিকে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট মিলিয়ে সরবরাহ এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট।

এদিকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চালু রয়েছে। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হতে অন্তত চার দিন সময় লাগতে পারে। তবে কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটির উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। এর আগে কেন্দ্রটিতে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল।

দেশের আরও দুটি বড় কেন্দ্র থেকেও সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রের এক হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৯৩০ মেগাওয়াট। একই সক্ষমতার পায়রা কেন্দ্র থেকে মিলছে প্রায় ৫৮০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় দুই মাস পায়রা কেন্দ্রের উৎপাদন কম।

এদিকে গ্যাস সরবরাহের তথ্য বলছে, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬২ কোটি এবং এলএনজি থেকে এসেছে ৭০ কোটি ঘনফুট। গতকাল একই সময়ে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৬ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ দুদিনে মোট সরবরাহ বেড়েছে চার কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ দুই কোটি কমে হয়েছে ১৬০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে এলএনজি সরবরাহ সাড়ে পাঁচ কোটি ঘনফুট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুটে।

বিদ্যুতে বড় ঘাটতি

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৮৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৫ হাজার ৪২৯ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

এর আগে বিকেল ৩টায় ১৫ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৮০৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল দুই হাজার ১৩৯ মেগাওয়াট। 

সকাল ১১টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৯৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৩ হাজার ৮২২ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ৬৭৫ মেগাওয়াট। সকাল ৭টায় ঘাটতি ছিল এক হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট এবং ভোর ৫টায় এক হাজার ৮৫২ মেগাওয়াট।

আগের রাতেও ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য। শনিবার রাত ৮টায় লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৮১৩ মেগাওয়াট। রাত ৯টায় দুই হাজার ৭৯৭ এবং রাত ১০টায় দুই হাজার ৩৪৪ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। মধ্যরাতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ১৪৮ মেগাওয়াটে।

সিলেট, হবিগঞ্জেও উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। দুই জেলায় ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় দুই হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। বিবিয়ানা, বিবিয়ানা-৩ ও বিবিয়ানা সাউথ তুলনামূলক ভালো উৎপাদন করলেও শাহজীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, কুমারগাঁওসহ কয়েকটি কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ ও কেন্দ্রগুলোর যান্ত্রিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এর অন্যতম কারণ।

সিলেটের গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীতেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। সেখানে প্রায় ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, পাঁচ-ছয় মাস ধরে দিনে সাত থেকে আটবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। কোনো কোনো দিন টানা তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিসিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এতে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার পাশাপাশি ভোল্টেজের ওঠানামায় কারখানার যন্ত্রপাতি বিকল হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের কিস্তি, কর ও কারখানার নিয়মিত খরচ পরিশোধ নিয়েও চাপে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

ঝালকাঠিতেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। জেলার বিসিক শিল্পনগরীর চালু ১৩ কারখানায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে পাইপ উৎপাদন কারখানায় মেশিন চালু অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পাইপ আটকে গিয়ে পণ্য নষ্ট হচ্ছে।

ঝালকাঠির একটি বড় ময়দা মিলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদন কমায় শ্রমিকদের আয়ও কমেছে। বেকারি, লবণ উৎপাদনসহ অন্যান্য কারখানাতেও একই রকম প্রভাব পড়েছে।

ঝালকাঠি ওজোপাডিকোর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান জানান, জেলার বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকার কারণেই লোডশেডিং বেড়েছে।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সিলেট ব্যুরো ও ঝালকাঠি প্রতিনিধি)

আরও পড়ুন

×