অভিমত
সরকার আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি
নাজনীন আহমেদ
নাজনীন আহমেদ
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। একসঙ্গে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পড়বে। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে পরোক্ষভাবে এবং কিছুটা সময় নিয়ে।
তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বিশেষ করে গণপরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাবও রয়েছে। কৃষিতে জ্বালানি ব্যবহারের খরচ বাড়বে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। কলকারখানায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এসব প্রভাব হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারের দিক থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য ভর্তুকির চাপ কমানো। সরকারকে জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির বোঝা কমানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন জ্বালানির দাম কতটুকু বাড়ানো হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব জ্বালানি তেলের ব্যবহারকারী এবং ব্যবহারক্ষেত্র এক নয়।
পেট্রোল ও অকটেন তুলনামূলক উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি ব্যবহার করেন। অবশ্য মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ অকটেন ব্যবহার করে, বিশেষ করে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবায় মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়। ডিজেল গণপরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। একটি বাসে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব একসঙ্গে অনেক মানুষের ওপর পড়ে। একই সঙ্গে কৃষি এবং শিল্প-কারখানায় ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। কেরোসিনের ক্ষেত্রেও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমার মনে হয়, সরকার চাইলে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম না বাড়িয়ে অথবা খুব কম বাড়িয়ে পেট্রোল ও অকটেনের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়ানো যেত। এখনও বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এতে ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্য পুরোপুরি হয়তো অর্জিত হয়তো হবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম রাখা সম্ভব হবে।
সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে; একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছে, তাও দেখতে হবে। আমাদের সমাজে আয়বৈষম্য অনেক বেশি। জ্বালানি তেলের ভর্তুকির সুবিধা যেমন উচ্চআয়ের মানুষ পান, তেমনি নিম্নআয়ের মানুষও পান। ফলে ঢালাওভাবে সব ধরনের জ্বালানির দাম একইভাবে বাড়ানো হলে প্রশ্ন আসে— নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব কি যথেষ্ট বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাই সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের আয়স্তর বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এর সঙ্গে এবার আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে— সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো। শুধু পে স্কেল নিজে মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু নতুন পে স্কেল এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে মানুষের মধ্যে একটি ‘ইনফ্লেশনারি এক্সপেক্টেশন’ বা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা তৈরি হলে তা বাজারের স্বাভাবিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন আমি যদি চালের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে চালের দাম আরও বাড়বে, তাহলে আজই সব চাল বিক্রি না করে কিছুদিন ধরে রাখতে চাইতে পারি। একইভাবে আমি যদি পেঁয়াজের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে পেঁয়াজের দাম বাড়বে, তাহলে বিক্রি না করে কিছুদিন মজুত রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তখন স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার বাইরে কৃত্রিমভাবে পণ্য ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে মূল্য আরও বাড়তে পারে।
আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজনীয় ব্যয় অবশ্যই করতে হবে। তবে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। অনেক সরকারি অফিসে অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। জেলা শহরের অফিস, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদাহরণ রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা, সরকারি সফর, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও পর্যালোচনা করা দরকার। পে স্কেলের মাধ্যমে সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি
- বিষয় :
- অভিমত
- জ্বালানি তেল
- মূল্যবৃদ্ধি