ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘মরার আগে ছেলেটাকে একবার দেখতে চাই’

সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ

‘মরার আগে ছেলেটাকে একবার দেখতে চাই’
×

রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি নিখোঁজ হয় আট বছর বয়সী জুনায়েদ হাসান সকাল। আট বছর ধরে তাকে খুঁজছেন মা-বাবা। গত রোববার তাদের ভাড়া বাসা থেকে তোলা -মামুনুর রশিদ

 রাসেল মাহমুদ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মরে যাওয়ার আগে আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে একবার দেখে যেতে চাই। এটিই আমার শেষ ইচ্ছা। আর কোনো চাওয়া নাই। কতটা বছর হলো, ছেলেটাকে দেখি না! এমন একটা রাত নাই, ছেলের কথা ভেবে আমার চোখে পানি আসে না।’ রাজধানীর লালবাগে ভাড়া বাসায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলেন নিখোঁজ শিশু জুনায়েদ হাসান সকালের বাবা মো. ইসমাঈল হাসান।

লালবাগের খান মোহাম্মদ মসজিদের পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকাকালে ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি সকাল নিখোঁজ হয়। তখন তার বয়স ছিল ৮ বছর।

ইসমাঈল এখন লালবাগের ২০/২০ হাজি বিল্ডিংয়ের পাঁচতলার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে স্ত্রী, এক মেয়ে ও শ্যালককে নিয়ে থাকেন। গতকাল রোববার বিকেলে সেই বাসায় ইসমাঈলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ২০২১ সালে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এর পর থেকে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। কথাও জড়িয়ে আসে।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসমাঈল। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে প্রায় প্রতিদিন আমিই স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসতাম। আমার ভাইদের কোনো ছেলে নাই। আমার একটামাত্র ছেলে ছিল। কিন্তু সেই সকাল হারিয়ে গেল। কত খুঁজছি। কোথাও হদিস পাইনি।’

ইসমাঈল হাসান আগে ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। পরিবারে আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাঁর স্ত্রী মুক্তা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতেন। ছেলে হারানোর পর তা ছেড়ে দেন। 

ছেলে নিখোঁজের পর লালবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ইসমাঈল। পরে এটি অপহরণ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। থানা পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে। এখন কোন সংস্থা মামলাটি তদন্ত করছে, তা জানেন না ইসমাঈল।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের হারিয়ে যাওয়া শিশু মো. রায়হানকে উদ্ধারের প্রসঙ্গ টেনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সকালের মা মুক্তা বলেন, ‘একটা ছেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা ছেলেটার পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তির কাজে লাগাত তাকে। পা কাটা সেই ছেলেটা তার মায়ের কাছে ফিরে গেছে। আমার বুকটা তখন ছাঁৎ করে উঠেছে। আমার ছেলেটাকেও যদি এভাবে খুঁজে যাওয়া যেত!’

এদিকে হারিয়ে যাওয়া নাতনির জন্য প্রতীক্ষা করেন হালিমা নামের এক নারী। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের টিনপট্টি এলাকার ৯৭ নম্বর বাসার একটি কক্ষে নাতনি মাইমুনা আক্তার জান্নাতকে (১০) নিয়ে থাকতেন হালিমা আক্তার। গত ২০ মে সকালে নিখোঁজ হয় মাইমুনা। তেজগাঁও থানায় জিডি করা হয়। কিন্তু চার মাস পার হলেও শিশু মাইমুনার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সোমবার বিকেলে কথা হয় হালিমার সঙ্গে। তিনি জানান, কারওয়ান বাজারে সরকারি একটি অফিসে দুপুরের রান্নার কাজ করেন। মাইমুনাকে নিয়ে টিনশেডের এক রুমে থাকতেন। সে নিখোঁজ হওয়ার পর ওই বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে নাতনি মাইমুনার কাপড় ও ব্যাগ আগলে রেখেছেন।

হালিমা জানান, তাঁর তিন ছেলের মধ্যে মাইমুনা ছিল মেজো ছেলের মেয়ে। মাইমুনার যখন তিন বছর বয়স, তখন তার মা মারা যায়। তার বাবা আরেকটা বিয়ে করেন। তারা চট্টগ্রামে থাকে। সেখানে একটি মাদ্রাসায় পড়ত মাইমুনা। পরিবারে তাকে নিয়ে ঝামেলা হতে দেখে হালিমা গত বছরের শেষ দিকে মাইমুনাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

হালিমা সমকালকে বলেন, ‘আমার নাতনিটা অনেক অযত্নে বেড়ে উঠেছে। তার প্রতি আমার অনেক টান ছিল। তাকে ঢাকায় এনে নিজের কাছে যত্নে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটাকে নিয়ে এসে হারিয়ে ফেললাম। বাড়িতে যদি থাকত, যেমনই থাকত, অন্তত হারাইত না। এটা ভেবে আমার খুব খারাপ লাগে।’

এদিকে গত ৬ সেপ্টেম্বর ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শিরোনামে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে ও জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রায় ৪০টি পরিবারের মা-বাবা ও স্বজনরা হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

দেশে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদরদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।

 

আরও পড়ুন

×