গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক সহযোগিতা জরুরি: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
ইতালির রোমে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় ওয়ান হেলথ কার্যক্রমের জন্য বৈশ্বিক সম্মেলনের পার্শ্ব অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:২৮
ছাগল ও ভেড়ার ভাইরাসজনিত রোগ পিপিআর এবং গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত রোগ এফএমডি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তবে সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণিরোগ হওয়ায় এসব রোগ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উন্নয়ন সহযোগী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে টেকসই অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা ও শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আয়োজিত ‘কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় ওয়ান হেলথ কার্যক্রমের জন্য বৈশ্বিক সম্মেলন’-এর একটি পার্শ্ব অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। ‘ওয়ান হেলথ এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণিরোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের মাধ্যমে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর’ শীর্ষক ওই আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আরও জোরালো টিকাদান এবং সক্রিয় নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করেছে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশ এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাগল ও ভেড়ার পিপিআর রোগমুক্ত দেশের মর্যাদা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক কৌশল এবং ২০২৪ থেকে ২০২৮ মেয়াদের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে ছাগল ও ভেড়ার পিপিআর টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ। রোগের নজরদারি কার্যক্রমে কোনো প্রাদুর্ভাব শনাক্ত না হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পিপিআর নির্মূল কর্মসূচির নথি বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোগ নিয়ন্ত্রণের ধাপে ধাপে অগ্রগতির পথ অনুসরণ করে ২০২৫ থেকে ২০২৮ মেয়াদের জন্য এফএমডি নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক এফএমডি টিকাদানের ছয়টি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। সপ্তম ধাপের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, নিরাপদ ও টেকসই মাংস রপ্তানির ভিত্তি গড়ে তুলতে এফএমডিমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এফএমডি নিয়ন্ত্রণে কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ এফএমডির চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি নির্দেশিকা এবং প্রাণিরোগের প্রাদুর্ভাব তদন্ত ও মোকাবিলা বিষয়ে একটি মাঠপর্যায়ের নির্দেশিকা তৈরি করেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জাতীয় এফএমডি নিয়ন্ত্রণ কৌশল ২০২৫–২০২৮ এবং পিপিআর নির্মূলের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪–২০২৮ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে বলেও জানান তিনি।
এফএমডির এসএটি-১ ধরনের ভাইরাসের বিস্তার নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো এই ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। তবে বিভিন্ন কারণে এর প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত পারাপার, প্রাণিসম্পদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল, প্রাণিসম্পদ-সম্পর্কিত উপকরণ আমদানি এবং ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশুর চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে এই ভাইরাস প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণিরোগের ক্ষেত্রে একটি দেশের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রোগের বিস্তার ঠেকাতে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি, তথ্য বিনিময়, টিকাদান ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় তানজানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুইগুলু লামেক নচেম্বা, চাঁদের প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদেরাহিম আওয়াত আবেইথ, ক্যামেরুনের প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও প্রাণী শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী তাইগা, নাইজেরিয়ার প্রাণিসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ইদি মুখতার মাইহা এবং মঙ্গোলিয়ার খাদ্য, কৃষি ও হালকা শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্টেট সেক্রেটারি জামবালসেরেন তুমুর-উয়া অংশ নেন।
এ ছাড়া আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের ড. ওয়ার্কনেহ গেবেয়েহু, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মার্টিন সেলমায়ারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় প্রাণী, মানুষ ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রাণিরোগ নিয়ন্ত্রণে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- সুলতান সালাউদ্দিন টুকু
- প্রতিমন্ত্রী