ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

নেতাদের চাপে পিডি বদলের উদ্যোগ, কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

নেতাদের চাপে পিডি বদলের উদ্যোগ, কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৩:০১

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতায় চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আকস্মিকভাবে জুম সভা করে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা তাদের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই নতুন পরিচালকদের নাম প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রস্তাবটি আটকে দিয়েছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে থেকে সভার নোটিশ না দিয়ে গত রোববার পিডি পরিবর্তন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে হঠাৎ একটি জুম সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। সভায় বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে ফাইল তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। যদিও পরদিন কৃষিমন্ত্রী পুরো প্রস্তাবনা আটকে দিয়েছেন। 

সভায় অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরিজীবনে এমন প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে এত প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখিনি। সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে; পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কিংবা প্রশাসনিক কারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর নতুন নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত দক্ষতা ও কর্মসম্পাদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার হঠাৎ জুম মিটিং করে পিডি পরিবর্তনের ফাইল তৈরি করা হয়েছে। সভায় নতুন যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। একইভাবে বর্তমান পরিচালকদের কেন পরিবর্তন করতে হবে; প্রকল্পের অগ্রগতি কেমন; তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না– এসবও গুরুত্ব পায়নি।

তিনি আরও বলেন, সভাটি থেকে মনে হয়েছে, আগে থেকেই তৈরি করা একটি তালিকাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য এই সভা করা হয়েছে। মূলত কৃষক দলের এক নেতাসহ দুজন  মন্ত্রণালয়ে এসে কৃষি সচিবকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়ে পিডি পরিবর্তনের চাপ দিয়েছিলেন। এরপর জুম মিটিং করা হয়। পরে কৃষিমন্ত্রী বিষয়টি দেখে অসংগতি পেয়েছেন এবং ফাইলটি আটকে দিয়েছেন। 

প্রকল্পের প্রতিটির জন্য নতুন পরিচালক হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন পরিচালকদের কয়েকজনকে নিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক আব্দুল কায়ূম মজুমদারের পরিবর্তে বান্দরবানে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারের নাম প্রস্তাব করা হয়। আব্দুল গফফার ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় শাস্তি পেয়েছিলেন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করার সময় তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন না করে বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে আবেদন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই অংশের পরিচালক হিসেবে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই প্রকল্পে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা মনিটরিং কর্মকর্তা ও উপপ্রকল্প পরিচালক তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ। এ ছাড়া সম্প্রতি বদলি হয়ে রংপুরে যাওয়া মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে অন্য একটি প্রকল্পে কর্মরত উপপ্রকল্প পরিচালক এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত অধিকাংশ পিডির প্রকল্প পরিচালনা করার মতো কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

এদিকে পিডি পরিবর্তনের এই উদ্যোগ ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, পিডি পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানোর জন্য ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তি হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই পিডি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির চলছিল। এর মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের পর ডিএইর ১২ জন প্রকল্প পরিচালক বদলি করা হয়। এরপর সম্প্রতি আবার এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) ও কৃষক দলের কয়েক নেতা পিডি পরিবর্তনের তদবির করছেন। 

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে গতকাল রাতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করার কোনো এখতিয়ার নেই।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সমকালকে বলেন, আমি বিষয়টি জেনেছি। সম্ভবত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এই প্রস্তাবনা পাঠাতে পারেন। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। কেন হঠাৎ এতজন প্রকল্প পরিচালক বদলির প্রস্তাব এসেছে, তা আমি খতিয়ে দেখব। প্রকল্প পরিচালক বদলি ও পদায়ন নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলেও তা খতিয়ে দেখব।

আরও পড়ুন

×