ডেঙ্গুতে আট মাসের চেয়ে বেশি মৃত্যু সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে
এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটও প্রকট। বাধ্য হয়ে মেঝে-সিঁড়িতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। অতিরিক্ত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল থেকে তোলা ফোকাস বাংলা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এই রোগে আটজনের প্রাণ গেছে। এ নিয়ে চলতি মাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১২ জন। যেখানে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মারা গেছে ৯৭ জন।
গত এক দিনে নতুন করে এক হাজার ৭৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৫১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১৯৪ জন এবং ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালে ৩৭১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। চট্টগ্রামে ২৮৮ জন এবং খুলনায় ২৮৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া বরিশালে ১৬৪, রাজশাহীতে ১৩০, ময়মনসিংহে ১০৮, রংপুরে ৭৩ এবং সিলেটে ১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৭৫৭ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ হাজার ১৪৯ জন। তাদের মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরের সংক্রমণে ঝুঁকি বেড়ে যায়। একাধিকবার সংক্রমিত হলে রোগের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা মারার কার্যক্রম চালালেই হবে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিতভাবে ধ্বংস করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জনঘনত্ব, মানুষের চলাচল, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং পানি সংরক্ষণের ধরনও এতে ভূমিকা রাখে। বাড়িতে পানি জমিয়ে রাখলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
সংস্থাটির মতে, নিয়মিত মশার উপস্থিতি ও বিস্তার নজরদারি, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও মানুষের চলাচলের পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বদলে যেতে পারে।
২০২৩ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। সরকারি হিসাবে, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছর তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
গত বছরও ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ২ হাজার।
চলতি বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে ডেঙ্গুর মৌসুমে হাসপাতালগুলোর ওপর চিকিৎসার চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে ছয় মাসব্যাপী জরুরি ডেঙ্গু মোকাবিলা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোর প্রায় তিন লাখ মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেওয়া হবে।
এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণ এলাকা; বিশেষ করে– ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ কক্সবাজারের ক্যাম্প ও আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এই কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিবেচনায় এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে অন্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
বিডিআরসিএস মহাসচিব মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, ডেঙ্গু দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি। রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় পরিবারগুলোকে সহায়তা করার উদ্যোগ জোরদার করছি।
- বিষয় :
- ডেঙ্গু