ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট, জন্মহার বাড়ার ঝুঁকি

মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট, জন্মহার বাড়ার ঝুঁকি
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অধিকাংশ উপজেলায় সরকারি ব্যবস্থায় সরবরাহ করা কোনো না কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থ সংকটে সরবরাহ বন্ধ থাকায় আড়াই বছর ধরে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও জন্মহার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সংকট কাটাতে বিশেষ ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৫৩ লাখ নারী গর্ভবতী হন। তাদের প্রায় ৪৯ শতাংশের গর্ভধারণ অনিচ্ছাকৃত। তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশ এমআর (মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন) পদ্ধতিতে গর্ভপাত করান। আবার ৪১ শতাংশ অনিরাপদ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাতের পাশাপাশি দেশে জন্মনিরোধক ব্যবহারের হারও কমেছে।

সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহের চিত্র ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে থাকা ৪৯৩টি উপজেলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ উপজেলায় এক বা একাধিক জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুত নেই। আবার কোনো কোনো উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সামগ্রী মজুত রয়েছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কনডমের মজুত নেই ১৯০টি উপজেলায়। বিপরীতে ১৮৯টি উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মজুত রয়েছে। ৪৯টি উপজেলায় কনডমের মজুত শেষ হওয়ার পথে এবং ৩৬টি উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় কম মজুত রয়েছে। মাত্র ২৯টি উপজেলায় কনডমের সরবরাহ সন্তোষজনক। অর্থাৎ ৪৯৩ উপজেলার মধ্যে ২৭৫টিতেই কনডমের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।

দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আইইউডির (ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ডিভাইস) সংকট আরও প্রকট। ৪২০টি উপজেলায় আইইউডির মজুত শূন্য। আরও আটটি উপজেলা রয়েছে মজুত শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে। ইমপ্লান্টের ক্ষেত্রে ৩৮৫টি উপজেলায় কোনো মজুত নেই এবং ৫১টি উপজেলা রয়েছে মজুত শেষ হওয়ার পথে। সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির মজুত নেই ৩৪০টি উপজেলায়।

অন্যদিকে একই ড্যাশবোর্ডে দেখা যাচ্ছে, ৩১টি উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আইইউডি এবং ১৯টি উপজেলায় বেশি ইমপ্লান্ট মজুত রয়েছে। অর্থাৎ কোনো উপজেলায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী না থাকলেও অন্য কোনো উপজেলায় একই সামগ্রী অতিরিক্ত পড়ে আছে। এতে সরকারি পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সংগ্রহের পাশাপাশি চাহিদা নিরূপণ, মজুত ব্যবস্থাপনা ও সময়মতো পুনর্বণ্টনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস। নিরাপদ ও কার্যকর গর্ভনিরোধের সুযোগ নিশ্চিত করা, এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং নারী-পুরুষকে নিজেদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়াই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। তবে দেশে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহের বর্তমান চিত্রে অনেক উপজেলায় সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

কমেছে জন্মনিরোধক ব্যবহার
সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও অবনতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। 

আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে এসেছে। একই সময়ে মোট প্রজনন হার বা টিএফআর ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে সংকট
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ১৯৭৫ সালে দেশে মোট প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক ৩। ২০২২ সালে তা ২ দশমিক ১৫-এ নেমে এলেও ২০২৫ সালে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। তিনি বলেন, গত দুই বছর অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় মাঠপর্যায়ে প্রচার ও প্রয়োজনীয় সংস্থান সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। দেশে বাল্যবিবাহের হার ২৪ শতাংশ। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ৪৯ শতাংশ এবং এর ৬১ শতাংশের ক্ষেত্রে অনিরাপদ গর্ভপাত হচ্ছে।

সরকারি পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা জনবল সংকট। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ২২৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১৪ হাজার ৫৫০টি পদ শূন্য। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ২৭ শতাংশে কোনো জনবল নেই।

এক বছরে ২২ কর্মসূচি
এই পরিস্থিতিতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নভেম্বর থেকে এক বছরের জন্য ২২ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

২২ দফা কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে মহিলা সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্তকরণ, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রচার, হাটবাজারে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ততা, ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা, ‘মা ও গর্ভবতী সুরক্ষা সমাবেশ’, বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীকে সেবা, ২৩ হাজার ৫০০ ইউনিটে ‘ওয়েলবিং ক্লাব’ গঠন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘পরিবার সংলাপ’, কৈশোর ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, নবদম্পতি কাউন্সেলিং এবং পুরুষদের সম্পৃক্তকরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক বলেন, ২২টি আলাদা কর্মসূচি বা বড় বাজেট ও জনবলের পেছনে না ছুটে পরিবার পরিকল্পনার মূল সেবায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রচার।
 

আরও পড়ুন

×