ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নামেই উত্তরা মডেল টাউন

নামেই উত্তরা মডেল টাউন
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০১৫ | ১৩:২১


নামে মডেল টাউন হলেও উত্তরা এলাকায় শুধু 'নেই আর নেই'। সাধারণের চিকিৎসার জন্য নেই সরকারি হাসপাতাল। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার মতো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। খেলাধুলার জন্য নেই সরকারি মাঠ। নেই সিটি করপোরেশনের পাঠাগার। সংখ্যালঘুদের জন্য নেই কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়। নেই সরকারি কমিউনিটি সেন্টার, সরকারি বাজার ও কবরস্থান। অথচ মডেল টাউন নির্মাণের উদ্যোগ হিসেবে ১৯৬৫ সালে যাত্রা করেছিল ওই এলাকা। উত্তরায় বর্তমানে সেক্টর ১৮টি। লোকসংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। ভোটারও এক লাখের মতো। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও এলাকাবাসীর বহু সমস্যার সমাধান হয়নি।



সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরার আবদুল্লাহপুর খালে দু'পাশ থেকেই ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। ১, ৩, ৫, ৭, ৮, ৯, ১১ ও ১২ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি সেক্টরের বাসাবাড়ির ময়লা পানি পড়ছে খালে। পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে খালের ওপাশের ফুলবাড়িয়া ও হরিরামপুর গ্রামের মানববর্জ্য ও পোলট্রি খামারের বর্জ্য। কিছু বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের চিকিৎসা-বর্জ্যের ভাগাড়েও পরিণত হয়েছে খালটি। দুর্গন্ধযুক্ত এসব বর্জ্যের ভাগাড়ে জন্ম নেওয়া পোকামাকড় ও মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।



বাউনিয়া দ্বিগুণ খালের সংযোগস্থল থেকে উৎপত্তি হওয়া খালটি হরিরামপুর, রানাভোলা, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, দলিপাড়া এবং ১২, ১১ ও ৯ নম্বর সেক্টর হয়ে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। এ খালের অব্যবস্থাপনাই এখন উত্তরা মডেল টাউনের বড় সমস্যা। মশা নিয়ন্ত্রণে মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও তাতে কোনো কাজ হয় না বলে জানান ১১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা সৈয়দ ইসতিয়াক অগ্রদূত। এ ছাড়া ১০ নম্বর সেক্টরের লেকের পানি ময়লা আর আবর্জনায় কালচে হয়ে গেছে।



৫ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা নাজমা ইসলাম জানান, এলাকায় কোনো সরকারি কলেজ নেই, উত্তরার লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। নেই এলাকার কিশোর-যুবকদের জন্য সরকারি খেলার মাঠ, স্টেডিয়াম, ইনডোর গেমস কমপ্লেক্স, জিমনেসিয়াম ও সুইমিংপুল। বাসার ছাদ কিংবা রাস্তার ধারে ব্যাট-বল, ফুটবল হাতে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায় শিশু-কিশোরদের। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি মাঠ থাকলেও একই মাঠে বাচ্চাদের খেলা, বৃদ্ধদের হাঁটাহাঁটি ও যুবকদের আড্ডায় সমস্যা হয়।



সংখ্যালঘুদের জন্য উত্তরায় কোনো মন্দির, গির্জা কিংবা প্যাগোডা নেই। মরদেহ দাফনের জন্য মডেল টাউনে নেই সরকারি কবরস্থানও। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর এ এলাকায় কোনো সরকারি পাঠাগারও নেই। সরকারি হাসপাতাল ও নারী-শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। আগে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল নামে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও এখন তা চলছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিয়েশাদির জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলা হয়নি। বাসার ছাদ কিংবা বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টারেই সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় সরকারি বাজারও নেই উত্তরায়। ফুটপাত থেকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হয় জনসাধারণকে। এ ছাড়া জরুরি অগি্ননির্বাপণ ও দুর্ঘটনা রোধে কোনো জুতসই ফায়ার স্টেশনও নেই।



ভাঙাচোরা রাস্তা উত্তরাবাসীর নিত্য সমস্যা। ৫, ৭ ও ৮ নম্বর সেক্টরের সব রাস্তাই ভাঙা। ইট-সুড়কি উঠে গেলেও সংস্কারের উদ্যোগ নেই দীর্ঘদিন ধরে। অন্য সেক্টরগুলোতে ইট, বালি, লোহার রডসহ নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপর রাখা হয়। বাড়িঘর নির্মাণের পানিও গড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। ৫, ৭, ৮, ১১, ১২, ৩, ১৬, ১৫ নম্বরসহ অধিকাংশ সেক্টরেই এ চিত্র দেখা যায়। ১, ৩, ৭, ১১ ও ১২ নম্বর সেক্টরে সব সময় থাকে রিকশাজট। স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সামনে হয় যানজট। এসব রাস্তার ওপরেই ভ্যানের ওপর বসানো হয় অস্থায়ী বাজার। ৩, ৫ ও ১১ নম্বর সেক্টরের ফুটপাতজুড়ে বসে মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান।



ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জসীমউদ্দীন এভিনিউ থেকে হাউজ বিল্ডিং বাসস্টপেজ ও রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স থেকে রবীন্দ্র্রসরণি পর্যন্ত সড়কে সারি সারি রিকশাভ্যানেও দোকানের পসরা। এগুলোর আবর্জনাও ফেলা হয় রাস্তায়। ৩, ৮, ১১ ও ১৭ নম্বর সেক্টরেও রাস্তায় ফেলা হয় আবর্জনা। আর ৭ ও ৯ নম্বর সেক্টরের মধ্যবর্তী সোনারগাঁও জনপথ সড়কের ফুটপাত পুরোটাই বেদখল। কয়েকটি সেক্টরের সংযোগ সড়কের পাশে সাইনবোর্ডে ভারী যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হয় না।



উত্তরা মডেল টাউনের পূর্ব পাশে রেললাইন, পশ্চিম দিকে হরিরামপুর ইউনিয়ন, উত্তরে তুরাগ নদ এবং দক্ষিণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তবে কোনো পাশেই স্থায়ী নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। এতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা হচ্ছে। ভবনগুলো অস্থায়ী দোকান ও বহিরাগতদের মাদক সেবনের নিরাপদ স্থান। উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে সব সময় লোকাল ও দূরপাল্লার বাস থামলেও সেখানে কোনো যাত্রীছাউনি নেই। রোদ-বৃষ্টিতে যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।



উত্তরা অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. মঈনউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, উত্তরার উন্নয়নে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার বনিবনা না হওয়ায় বাসিন্দাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।



তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনসার আলী খান সমকালকে বলেন, উত্তরাবাসীর এসব সমস্যা কেবল সিটি করপোরেশনের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। রাস্তাঘাট, মশা বা উন্মুক্ত ড্রেনের সমস্যা হলে সেগুলো ডিএনসিসি সমাধান করতে পারে। কিন্তু একটি বড় খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা ডিএনসিসির পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জমি দিলে সেখানে ডিএনসিসি খেলার মাঠ তৈরি করে দিতে পারে। পাঠাগারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। উত্তরাবাসীর এসব চাহিদা পূরণ করতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


আরও পড়ুন

×