কান্তজীউ মন্দির যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা মহাকাব্য
রাজীব নূর ও আমিনুল হক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০১৫ | ১৩:৩৯
শুধু মন্দিরের জন্য নয়, দিনাজপুর জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নের যেখানটায় কান্তজীউ মন্দিরের অবস্থান, সে স্থানটি ঐতিহাসিকভাবেও অনেক প্রাচীন। কান্তনগর নামে পরিচিত ঢেপা নদী তীরের এই জনপদ নিয়ে রয়েছে অনেক লোকশ্রুতি ও লোকপুরাণ।
কথিত আছে, মহাভারতের বিরাট রাজার রাজত্বের অংশ ছিল এই এলাকা। মহাভারতে উলি্লখিত পঞ্চপাণ্ডব_ যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীম, নকুল ও সহদেব কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে এই বিরাট রাজার রাজমহলে ছদ্মবেশে এক বছর অজ্ঞাতবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের বেশির ভাগই মনে করেন, ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মহাঋষি বেদব্যাস সংস্কৃত ভাষায় ওই কাহিনী লিপিবদ্ধ করেন।
চাঁদ সওদাগরের উপাখ্যানের সঙ্গে আলোচিত এ অঞ্চলের স্মৃতি ও লোকশ্রুতির যোগসূত্র রয়েছে বলে লিখেছিলেন দিনাজপুরের ইতিহাস রচয়িতা মেহরাব আলী। তার 'দিনাজপুরের
ইতিহাসসমগ্র :৪' থেকে জানা যায়, কান্তনগরের অদূরে রয়েছে চাঁদের স্ত্রী সনকার নামে সনকাগ্রাম। লোকবিশ্বাস রয়েছে, কান্তনগরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বিরাট দীঘি ও ধ্বংসাবশেষসংবলিত বেলুয়া বা বেহুলা গ্রামে চাঁদ সওদাগরের পুত্রবধূ বেহুলার পৈতৃক নিবাস।
লোকশ্রুতিতে সমৃদ্ধ এই কান্তনগরে কান্তজীউ মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন রাজা প্রাণনাথ। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রাণনাথের মৃত্যু হয়। পরে রাজার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শেষ হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তি বেদিতে যে শিলালিপি রয়েছে, তার অনুবাদ করেছেন, 'প্রাসাদতুল্য অতিরম্য সুরচিত নবরত্ন দেবালয়ের নির্মাণকার্য নৃপতি প্রাণনাথ আরম্ভ করেন। রুক্মিণীকান্তের (শ্রীকৃষ্ণের) তুষ্টির জন্য [ও] পিতার সংকল্প সিদ্ধির নিমিত্ত ১৬৭৪ শাকে (১৭৫২ খ্রি.) নৃপতি রামনাথ কান্তের নিজনগরে (কান্তনগরে) কান্তের (শ্রীকৃষ্ণের) উদ্দেশ্যে এই মন্দির উৎসর্গ করেন।'
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তার 'বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ' বইয়ে কান্তজীউ প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত প্রচলিত একটি লোকশ্রুতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'কথিত আছে যে, বর্ধনকোটের জমিদারি জোরপূর্বক অধিকারের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজা প্রাণনাথকে একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে দিলি্ল যেতে হয়েছিল। অভিযোগ খণ্ডন করে প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি নাকি বৃন্দাবন তীর্থ দর্শনে গিয়েছিলেন। বৃন্দাবন ধামে একদা যমুনা জলে স্নানকালে তিনি কালো পাথরে তৈরি একটি কৃষ্ণমূর্তি নাকি আকস্মিকভাবে পেয়ে যান এবং কৃষ্ণভক্ত রাজা মূর্তিটিকে স্বীয় আবাসস্থলে যত্নসহকারে নিয়ে আসেন। সেদিন রাতেই নাকি তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন যে, এই মূর্তি তার নিজ রাজ্যে ও জলপথে নিয়ে যাওয়ার সময় নৌকা যেখানে নিজে থেকেই থেমে যাবে, সেখানেই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।'
লোকশ্রুতির উল্লেখ করলেও এতে বিশ্বাস স্থাপন করার যে কোনো কারণ নেই, তা-ও ব্যাখ্যা করেছেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া। তার মতে, খুব সম্ভব বর্তমানে কান্তনগর নামে পরিচিত এই অতি প্রাচীন ও পরিত্যক্ত স্থান রাজা প্রাণনাথ নতুন করে আবাদ করতে চেয়েছিলেন, তাই ঢেপা নদীর তীরবর্তী এ স্থানে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
মেহরাব আলী জেলা গেজেটিয়ার ও অন্যান্য তথ্যউপাত্ত ঘেঁটে লিখেছেন, দুইশ' বছর আগেও যে ঢেপার মূল প্রবাহ ছুটে চলত মন্দিরের পশ্চিম পাদদেশ বিধৌত করে, সেই ঢেপা ১৭৮৭ সালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর মন্দিরের পূর্ববাহিনী হয়ে গেছে। পরে আবার ১৮৯৭ সালে মন্দিরের চূড়া থেকে আদি নয়টি চূড়া ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। বিশ শতকের শুরুর দিকে মহারাজা গিরিজানাথ বাহাদুর ধ্বংস হয়ে নয়টি চূড়া ছাড়াই মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন। এই মন্দিরের ওপরে নয়টি চূড়া ছিল বলে একে নবরত্ন মন্দিরও বলা হয়।
প্রায় এক মিটার (৩ ফুট) উঁচু এবং প্রায় ১৮ মিটার (৬০ ফুট) বাহুবিশিষ্ট প্রস্তরনির্মিত একটি বর্গাকার বেদির ওপর এই মন্দির নির্মিত। পাথরের ভিত্তি বেদির ওপর মন্দিরটি ইটের তৈরি। বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ মিটার (৫২ ফুট)। মন্দিরের চারদিকে রয়েছে বারান্দা। প্রতিটি বারান্দার সামনে রয়েছে দুটি করে স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো বিরাট আকারের এবং ইটের তৈরি। স্তম্ভ ও পাশের দেয়ালের সাহায্যে প্রতিটি দিকে তিনটি করে বিরাট খোলা দরজা তৈরি করা হয়েছে। বারান্দার পরেই রয়েছে মন্দিরের কামরাগুলো। একটি প্রধান কামরার চারদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট কামরা।
ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর মন্দির। মন্দিরটির চিত্ররূপ দেখলে মনে হয়, এটি শুধু ইটের পর ইটে গাঁথা ইটের মন্দিরই নয়, বরং যেন মন্দিরের আকারে শিল্পীর আশ্চর্য কল্পনার রঙিন তুলি দিয়ে রচনা করা একখানা অলিখিত মহাকাব্য। ইটের তৈরি এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রফলকের সাহায্যে রামায়ণ-মহাভারতের প্রায় সব কয়টি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সে সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী এবং সম্রাট আকবর নিয়ে কিছু চিত্রকর্মও রয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণের অনেকগুলো লীলার একটি হলো রাসলীলা। প্রতিবছর কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ তার গোপীদের নিয়ে বৃন্দাবনে রাস উৎসবে মেতে উঠতেন। সেই ধারা অনুসারে ১৭৫২ সালে মন্দির নির্মাণের পর থেকে কান্তনগরের মন্দিরে রাস উৎসব এবং মাসব্যাপী রাসমেলা হয়ে আসছে।
দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর স্টেটের ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিনিধি অমল ভৌমিক জানান, মন্দিরের সাড়ে ৬২ একর জমি রয়েছে। ১০ থেকে ১৫ ভাগ জমি নদী ও বালুচরের মধ্যে রয়েছে। স্টেটের ট্রাস্টি ও দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কান্তজীউ মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বছরই প্রথম প্রত্নতত্ত্ব ও পর্যটন যৌথভাবে মন্দিরটি সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। এর আগে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মোটেল ও রেস্টুুরেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় কক্ষবিশিষ্ট শপিং সেন্টার ও একটি ওপেন রেস্টুুরেন্ট নির্মাণকাজ শুরু করেছে। আগামী জুন মাসের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
দিনাজপুর-১ আসনের সাংসদ মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, সরকার প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণ করায় মন্দিরে যাতায়াতে দর্শনার্থীদের অনেক সুবিধা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ ব্রিজটি নির্মিত হয়েছে এবং জুন মাসের মধ্যে এটি উদ্বোধন করা হবে।
- See more at: http://www.samakal.net/2015/04/23/132830#sthash.pyKmqfhX.dpuf