বারবার প্রাণহানির দায় কার
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০১:৪৯
তিন মাস আগে যমজ কন্যাসন্তানের বাবা হন শামীম মিয়া (৩৯)। সন্তানদের নিয়ে স্ত্রী থাকেন গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার সাদাঘরকান্দি এলাকায়। তবে ফুটফুটে শিশুদের পাশে থেকে আনন্দঘন সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়নি শামীম মিয়ার; বরং পরিবারের সদস্যদের খাবার জোটানোর তাগিদে ঢাকায় এসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছিলেন। সেই কাজ করতে গিয়েই নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কনটেইনার পড়ে মৃত্যু ঘটে এ নির্মাণ শ্রমিকের। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
এ নিয়ে পরপর দু’দিন এক্সপ্রেসওয়ের সরঞ্জাম পড়ে প্রাণ গেল দু’জনের। এর আগে বুধবার মগবাজারের দিলু রোড পানির পাম্প এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ে থেকে লোহার মই পড়ে মতিউর রহমান নামে এক পথচারীর মৃত্যু হয়। গত বছরের ২৯ মে বনানীতে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে রড পড়ে মারা যায় এক শিশু।
এদিকে, নির্মাণ-সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় বারবার এমন প্রাণহানির ঘটনায় নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। দাবি উঠেছে যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে নির্মাণকাজ চালানো ও ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য সেলিম রেজা সমকালকে বলেন, নিরাপত্তায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর এসব ঘটনা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। এর আগে এমন ঘটনায় আমরা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে কমিশন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবহেলা আছে। সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন শামীম মিয়া। গতকাল বেলা ১১টার দিকে তিনি তেজকুনিপাড়া রেল কলোনি সংলগ্ন বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের নিচে কাজ করছিলেন। তখন ক্রেন দিয়ে কনটেইনার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সময় সেটি এক্সপ্রেসওয়ের ৩৪৮ ও ৩৪৯ নম্বর পিলারের মাঝে পড়ে যায়। এতে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তেজগাঁও থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখান থেকে ক্রেন অপারেটর আজহারুল ইসলাম সোহাগকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে নেওয়া হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।
মৃতের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য শামীম। তাঁর আয়েই চলত সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে সবাই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। শামীমের স্ত্রীর নাম খাদিজা বেগম। তাদের বড় মেয়ের বয়স ৯ বছর। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে মারা যান শামীমের বাবা।
সাম্প্রতিক ঘটনার আগে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরার জসিম উদ্দীন রোডে নির্মাণাধীন বিআরটি ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে দুই শিশুসহ পাঁচজন নিহত হন।