ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মহাসড়ক থেকে অলিগলি পশুহাটের বিস্তার

মহাসড়ক থেকে অলিগলি পশুহাটের বিস্তার
×

শর্ত মানার গরজ নেই ইজারাদারের। হাটের পশু চলে এসেছে সড়ক-মহাসড়কে। এতে দেখা দিচ্ছে অসহনীয় যানজট। এলাকার মানুষ পড়ছেন ভোগান্তিতে। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার কলোনিবাজার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে তোলা সাজ্জাদ নয়ন

 অমিতোষ পাল ও লতিফুল ইসলাম 

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪ | ০১:৫০ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪ | ০১:৫১

বরাবরের মতো এবারও অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট। সিটি করপোরেশন শর্ত বেঁধে দিলেও ইজারাদারের যেন তা মানতে বয়েই গেছে। কোনো হাটের পরিধি নির্ধারিত চৌহদ্দির মধ্যে নেই। কোথাও হাট ছাড়িয়ে পশুর সারি মহাসড়কে, আবার কোথাও পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে চলে গেছে হাটের বিস্তার। যেখানে-সেখানে অবৈধ পশুহাটও চোখে লাগছে। সড়কের ওপর ট্রাকে ট্রাকে নামছে পশু। এতে সড়ক-মহাসড়কে যানজট ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে ঘণ্টা। এসব কারণে হাটের আশপাশ দিয়ে চলাচলে গলদঘর্ম হচ্ছেন এলাকার মানুষ। এর মধ্যে গতকালের শেষ বিকেলের বৃষ্টি ভোগান্তি বাড়িয়েছে আরও।

বেশির ভাগ হাটের ইজারাদার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মুখে এঁটেছে কুলুপ। এসব অব্যবস্থাপনা দেখেও তারা নীরব দর্শক। অভিযোগ আছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকে ম্যানেজ করে ইজারাদার হাটের পরিধি বাড়িয়ে নিচ্ছেন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’– এ প্রবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন তারা।

সিটি করপোরেশন বলেছিল, হাটের সীমানা পার হলেই ইজারা বাতিল করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমন তথ্য সমকালের কাছে নেই। 
দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের প্রবেশমুখ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আর পোস্তগোলা সেতুর প্রান্তেই বসেছে তিনটি পশুর হাট। সেগুলো বসেছে দনিয়া কলেজসংলগ্ন মাঠ, শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড আর পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন খালি জায়গায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দেওয়া শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানেই ইজারাদারের হাট বসানোর কথা। তবে কোনো ইজারাদার শর্ত মানেননি। দনিয়ার পশুহাটটি যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে শনির আখড়া পর্যন্ত বিস্তৃতি পেয়েছে। সেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দু’পাশে সারি করে রাখা হয়েছে গরু। এ মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত অন্য অলিগলিও এখন গরু-ছাগলের দখলে।

পোস্তগোলা সেতুর পূর্ব পাশের শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডের আশপাশের এলাকা ছেড়ে মহাসড়ক আর গলিতেও প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় হাট বসেছে। আর সেতুর পশ্চিম পাশের হাটটি বুড়িগঙ্গাতীরের বেড়িবাঁধে দুই সারিতে গরু বেঁধে রাখায় এ পথ দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। শনির আখড়া থেকে পোস্তগোলা হয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত সব সময় লেগে আছে যানজট। বাইরে থেকে আসা যানবাহন যাত্রাবাড়ী পৌঁছাতেই লাগছে কয়েক ঘণ্টা। ধোলাইখাল, লালবাগের রহমতগঞ্জ, কমলাপুর আর শাহজাহানপুর পশুর হাটের কারণে যাত্রাবাড়ীর এ যানজট হানিফ মোহাম্মদ ফ্লাইওভারের ওপরেও ছড়িয়েছে।

দনিয়া পশুহাটের ইজারাদার কামরুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘হাটে ব্যাপারীর অনেকেই এক গাড়ি গরু এনে জায়গা দখল করে রেখেছেন। তবে তারা এখনও ট্রাকে ট্রাকে গরু আনছেন। তাই জায়গা হচ্ছে না। ব্যাপারীরা গরু আনলে তো আর আমরা না করতে পারি না।’

শর্ত অনুযায়ী লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় হাট বসানোর কথা থাকলেও ইজারাদার ক্লাবের মাঠের সঙ্গে মহল্লার অলিগলিতে হাট বসিয়েছেন। ফলে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এ এলাকার যানজট গিয়ে ঠেকেছে বংশাল, নিউমার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর আশপাশের এলাকার সঙ্গে হানিফ ফ্লাইওভারে নামার পথ চানখাঁরপুলের দিকে। আবার ধোলাইখাল ট্রাকস্ট্যান্ডটি রায়সাহেববাজার থেকে দয়াগঞ্জ-মীরহাজিরবাগ, মুরগিটোলা থেকে লোহারপুল, ওয়ারীর টিপু সুলতান রোড ও নবাবপুর এলাকায় সড়কের দু’পাশে সারি করে পশু রাখা হয়েছে। আর মাঝখানে ট্রাক দাঁড় করিয়ে নামানো হচ্ছে গরু। আবার রায়সাহেব বাজারের পশুর ট্রাকের কারণে আটকে যাচ্ছে বাবুবাজার ব্রিজের প্রবেশমুখ।

অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল থেকে অসুস্থ মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়া তরিকুল ইসলাম বলেন, বরিশাল থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় এলেও ঢাকা ঢুকতেই লেগেছে আরও চার ঘণ্টা। গুগল ম্যাপে যানজট দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, কোন দিকে যাব। তারপরও বাবুবাজার ব্রিজের দিকে এগোই। তাতে লাভ হয়নি।’

তেজগাঁওয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠে শুধু হাট বসার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ইজারা দিলেও আশপাশে এক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে হাটের বিস্তৃতি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ডিঙিয়ে পূর্বে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের আশপাশ, লিন্ডে অফিসের আশপাশ, হকার্স মার্কেটের সামনের সড়ক ছাড়িয়ে মগবাজার-মহাখালী সড়কেও রাখা হয়েছে পশু। ফলে হাটের আশপাশের সড়ক দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে যাচ্ছে আশপাশের এলাকায়। মহাখালী বাস টার্মিনাল ব্যবহার করে ঘরমুখো মানুষ অসহ্য ভোগান্তিতে পড়ছেন।
রোকেয়া সরণির শেওড়াপাড়া থেকে পীরেরবাগ সড়কের অলি মিয়ার টেকে আবাসিক এলাকায় অবৈধ পশুহাট বসিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ। সড়কের মধ্যে বালু ফেলে ট্রাক থেকে হাটে পশু নামার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০ ফুট সড়কটিতে পশুর ট্রাক ঢোকার পর অন্যদিক থেকে আরেকটি গাড়ি পাশ দিয়ে যেতে পারছে না। কাদাপানি, খড়, ঘাস, লতাপাতা মিলে এক হযবরল পরিস্থিতি আশপাশের এলাকায়। 

সিটি করপোরেশনের পক্ষে হাটের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও ইজারাদার সে শর্ত মানছেন না। দুই সিটি করপোরেশন ২০টির ইজারা দিলেও এর বাইরে অনেকে হাট বসিয়েছেন। রাজধানীর তালতলা, লালমাটিয়া, বেড়িবাঁধ, কচুক্ষেত, সেগুনবাগিচা আবাসিক এলাকাসহ আরও কয়েকটি স্থানে এখন কেবলই অবৈধ গরু-ছাগলের হাট। কিছু ফড়িয়া ছাগল নিয়ে পাড়া-মহল্লায়ও বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গতকাল পর্যন্ত হাটে হাটে বেচাবিক্রি তেমন জমেনি। দু-একজন ক্রেতা গেলেও দরদাম করে ফিরে যাচ্ছেন। আজ শুক্রবার থেকে ক্রেতাসমাগম ঘটবে বলে তারা জানান। তবে গতকাল বিকেলের বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়েন পশু বিক্রেতারা। তারা বলেন, হাটে বৃষ্টি থেকে পশুকে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। 

কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাবসংলগ্ন খালি জায়গা ও স্টেডিয়ামসংলগ্ন বিশ্বরোডের পশুর হাটটি চলে গেছে ইত্তেফাক মোড় থেকে মতিঝিল ও কমলাপুর শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত। আর বিশ্বরোডের হাটটি মুগদা, গোলাপবাগ, মানিকনগর থেকে ধলপুর সিটি পল্লী পর্যন্ত ছড়িয়েছে। শাহজাহানপুরের হাটটি খেলার মাঠসহ রেলওয়ে কলোনির আবাসিক এলাকায় বসেছে। এ দুটি হাটের পশুর ট্রাকে মতিঝিল-কমলাপুর-রাজারবাগ আর খিলগাঁও এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দিচ্ছে।

খিলগাঁও মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন খালি জায়গায় কোরবানি পশুর হাট বসানোর কথা থাকলেও হাট গেছে বনশ্রী আবাসিক এলাকার অলিগলিতে। বাসাবাড়ি আর শপিংমলের সামনে সারি সারি গরু, বালু আর খড়ে অসহনীয় ভোগান্তির মুখে পড়ছেন এলাকার বাসিন্দারা। 

খিলক্ষেত এলাকার মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাট বসাতে ইজারা দিয়েছে ডিএনসিসি। কিন্তু ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওই জায়গায় হাট না বসিয়ে ৩০০ ফুট সড়কের সঙ্গে যমুনা হাউজিং ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় হাট বসিয়েছেন ইজারাদার। শর্ত ভেঙে গরু বাঁধার খুঁটি, প্যান্ডেল, হাসিল কাউন্টার, মেডিকেল বুথ ছাড়াও র‌্যাব-পুলিশের কন্ট্রোলরুমও বসেছে। হাটের ইজারাদার ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম স্বপন বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে তারা ইজারা নিয়ে হাট বসিয়েছেন। তবে ইজারার কাগজপত্রে যমুনা হাউজিংয়ের নাম লেখা নেই। 
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, ‘নির্ধারিত জায়গা ছাড়া যদি কোথাও হাট বসে, আমরা তা ভেঙে দেব। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী সমকালকে বলেন, ‘ঢাকা নগরে খালি জায়গার অভাব। তাই গরুর হাট আমাদের সড়কের মধ্যেই বসাতে হচ্ছে। ঈদ একটি উৎসব। এখানে কিছু সমস্যা হলেও সবাই আনন্দচিত্তে মেনে নেয়। তবে হাট নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

আরও পড়ুন

×