ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩০ বছর পর খুলল হত্যা মামলার জট

৩০ বছর পর খুলল হত্যা মামলার জট
×

সগিরা মোর্শেদ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৭ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ০০:০০

ত্রিশ বছর পর রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নিহতের স্বামী আবদুস সালামের মেজ ভাই বারডেমের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন। সগিরার উচ্চতর ডিগ্রি, চাকরি এবং শাশুড়ির অতি স্নেহ মেনে নিতে পারেননি মাহমুদা। পারিবারিক প্রতিহিংসার শিকার হন সগিরা। ঘরোয়া নানা বিষয়-আশয় নিয়ে সগিরা-মাহমুদার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। তাই সগিরাকে শায়েস্তা করতে স্বামী বারডেমের চিকিৎসক হাসান আলী চৌধুরীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন মাহমুদা। স্ত্রীর কথামতো ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সগিরাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ২৫ হাজার টাকায় খুনি ভাড়া করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী রমনা থানাধীন সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় সগিরাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এটি ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাইয়ের ঘটনা। হত্যায় জড়িত মূল শুটার মারুফ রেজা ছিলেন ডা. হাসানের রোগী। টাকার বিনিময়ে তাকে ম্যানেজ করেই ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে খুন করান তিনি। তিন দশক পর সগিরা হত্যা মামলায় ডা. হাসান, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন, হাসানের শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও মূল শুটার মারুফ রেজাকে এ সপ্তাহে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। এরই মধ্যে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

নিহতের স্বামী আবদুস সালাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করেন রমনা থানায়। পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনা সাজিয়ে ছয় ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার এবং পরে চার্জশিট দাখিল করে আদালতে। বিচারও নিষ্পত্তি হয় একসময়। কিন্তু ছিনতাইয়ের ঘটনা মানতে নারাজ বাদীপক্ষ। তারা পুনঃতদন্তের দাবি জানান। ৩০ বছর পর এসে সগিরা হত্যার আসল রহস্য উদ্‌ঘাটন হলো। পিবিআইর মাধ্যমে সত্য বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের নামে তৎকালীন পুলিশের 'ভুতুড়ে' ব্যক্তিকে চার্জশিটে আসামি করার আরেকটি ন্যক্কারজনক নজির সামনে এলো।

পিবিআই সূত্র জানায়, আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে গত ১০ নভেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে দু'দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আনাস। গত ১৩ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন মারুফ রেজা। নিজের দায় স্বীকার করে তিনিও গতকাল জবানবন্দি দিয়েছেন। ১২ নভেম্বর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন। পরদিন খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তারা।

সগিরা মোর্শেদ হত্যায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা

যেভাবে খুন করা হয়: সগিরা স্বামীর সঙ্গে থাকতেন রাজারবাগ এলাকায় নিজেদের বাড়িতে। চাকরি করতেন বিআইডিএসের গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে। তাদের তিন মেয়ে। এক মেয়ে সারাহাত সালমা ভিকারুননিসা স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তখন। ঘটনার দিন মেয়েকে স্কুল থেকে আনার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন সগিরা। স্কুলের সামনে পৌঁছামাত্রই তার রিকশার গতিরোধ করা হয়। মারুফ রেজা ভিকারুননিসা নূন স্কুলের একটু আগে মোটরসাইকেল দিয়ে সগিরার রিকশাটি আটকান। মারুফ সগিরা মোর্শেদের হাতব্যাগ নিয়ে নেন এবং হাতের চুড়ি ধরে টানাহেঁচড়া করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মারুফ রেজার সহযোগী আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকে চিনে ফেলেন সগিরা। তখন সগিরা তাকে বলেন, 'এই আমি তো তোমাকে চিনি, তুমি এখানে কেন?' এ কথা বলার পরপরই মারুফ রেজা কোমর থেকে পিস্তল বের করে একটি গুলি করেন, যা সগিরা মোর্শেদের হাতে লাগে। এরপর তিনি সগিরা মোর্শেদকে আরও একটি গুলি করেন, যা সগিরার বুকের বাঁ পাশে লাগে। সগিরা মোর্শেদ রিকশা থেকে পড়ে যান। তখন মারুফ রেজা আরও দুটি ফাঁকা গুলি করে মোটরসাইকেল নিয়ে আনাস মাহমুদ রেজওয়ানসহ পালিয়ে যান। মারুফ রেজা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের আত্মীয়।

পিবিআইর ডিজি বনজ কুমার মজুমদার গতকাল সমকালকে জানান, চলতি বছরের জুলাইয়ে হাইকোর্ট মামলাটির তদন্তভার পিবিআইর ওপর ন্যস্ত করে। এরপর বেরিয়ে আসে, হত্যার এক বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে সগিরা হত্যা মামলায় এক ছিনতাইকারীকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে মামলাটির বিচার কাজ চলাকালে প্রশ্ন ওঠে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সময় দু'জন ঘটনাস্থলে থাকলেও আসামি কেন একজন হবে। এই প্রেক্ষাপটে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। আদালত কেন মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন- এর বিরুদ্ধে রিট করেন এক নারী। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল কেন ওই নারী এমন রিট করলেন- যার সঙ্গে মামলার কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই। পিবিআই তদন্তের শুরুতে ওই রিটকারী নারীর ব্যাপারে খোঁজ নেয়। তখন বেরিয়ে আসে- ওই নারী হলেন শুটার মারুফ রেজার মা। এ ছাড়া ৩০ বছর পর প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাওয়ালাকে খুঁজে বের করা হয়। সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। হত্যাকারী দু'জনের চেহারা কী রকম ছিল সে বর্ণনা তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, মারুফ রেজার সঙ্গে তার বর্ণনার মিল রয়েছে। এরপর যে অস্ত্র ব্যবহার করে মারুফ গুলি করেছিলেন তার মালিকের নাম পাওয়া যায়। অস্ত্রের মালিকের নাম ছিল হরহর মুন্না। ২-৩ বছর আগে 'বন্দুকযুদ্ধে' মুন্না মারা যায়।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, অপরাধী যে কিছু না কিছু আলামত রেখে যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ সগিরা হত্যা মামলা। সেটা না হলে কেন এত বছর পর হত্যার ব্যাপারে এত তথ্য-উপাত্ত বেরোবে। তদন্ত সঠিক পথে থাকলে অপরাধীর পার পাওয়ার সুযোগ কম।

মামলার বাদী আবদুস সালাম চৌধুরী গতকাল সমকালকে বলেন, অনেক দেরিতে হলেও ন্যায়বিচার পেয়েছি। কয়েক দফা মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর আগে সাজানো চার্জশিটে নিরপরাধ ব্যক্তির সাজাও হয়েছিল। বহু দেরিতে হলেও সত্য বেরিয়ে এলো।

আরও পড়ুন

×