মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারের সমস্যা নয়, কাঠামোগত সংকট: সেলিম রায়হান
সেলিম রায়হান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৮
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন ক্রমেই কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তুলনামূলক দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেও বাংলাদেশে তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৯ শতাংশ হতে পারে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে শুধু বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বা সাময়িক সরবরাহ-সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এসব কারণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিগত দুর্বলতাও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী।
এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে এর সঙ্গে দুর্বল প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার বাধা, দুর্বল পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো পণ্যের উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যয় বাড়লে দাম দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই চাপ কমে গেলে দাম একই গতিতে কমছে না। বাজার তদারকির দুর্বলতা ও কার্যকর প্রতিযোগিতা নীতির অভাবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা প্রয়োজন হলেও শুধু সুদের হার বাড়িয়ে পণ্যবাজার ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
রাজস্বনীতিতেও বাড়ছে চাপ
মূল্যস্ফীতির আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায়। সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খাতে সরকারের ব্যয়ের অঙ্গীকার বাড়ছে। অন্যদিকে দেশের রাজস্ব আহরণ এখনো কাঠামোগতভাবে দুর্বল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়লে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অর্থায়নের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ঘাটতি অর্থায়ন অতিরিক্তভাবে বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও জোরদার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তার মতে, নতুন ব্যয়ের অঙ্গীকারের সঙ্গে টেকসই রাজস্ব উৎসকে যুক্ত করে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন চাপ
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ আরও বেড়েছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
ডিজেলের ব্যবহার পণ্য পরিবহন, সেচ, গণপরিবহন, জেনারেটর ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে খাদ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
সেলিম রায়হানের মতে, বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দেশের জ্বালানি খাতের অদক্ষতা, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর করভার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না করে বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে প্রয়োজনীয় মূল্যসমন্বয় বারবার মূল্যস্ফীতির নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বিনিয়োগেও স্থবিরতা
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকাও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা, জ্বালানি ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কথা বলে আসছেন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয়ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে পিছিয়ে দিতে পারে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান।
বিনিয়োগ কমে গেলে ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সরবরাহ সক্ষমতা ধীরে বাড়লেও নামমাত্র চাহিদা বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। একই সঙ্গে কম বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো পরিবারের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রয়োজন সমন্বিত নীতি
সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা রাজস্বচাপ, জ্বালানি ব্যয়ের নতুন ধাক্কা এবং দুর্বল বিনিয়োগ- এই চারটি চাপের সমন্বয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির সমস্যা হিসেবে দেখলে অর্থনীতির বড় চিত্রটি বাদ পড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির শৃঙ্খলার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকর প্রতিযোগিতা নীতি, জ্বালানি খাতের সংস্কার, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা এবং পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ প্রয়োজন।
এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার না হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাময়িক পরিস্থিতি না থেকে অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে স্থির বা ধীরে সমন্বিত আয়ের মানুষের ওপর।
- বিষয় :
- মূল্যস্ফীতি
- বাজার
- সংকট