জাতীয় পার্টি ভাঙেনি, মচকেছে

রাজনীতি

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শেখ রোকন

জাতীয় পার্টি বড় ধরনের ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে- কথাটি আমার নয়। বলেছেন দলটির খোদ মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। প্রায় এক সপ্তাহের 'অজ্ঞাতবাস' শেষে গত রোববার রীতিমতো সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি কথাটি বলেছেন। আর অজ্ঞাতবাসের কারণ হিসেবে যা বলেছেন, সেটাও যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি বলেছেন- 'পরিবারে পিতামাতা যখন বিবাদে জড়ান, তখন সন্তানরা বিপদে পড়েন। দলের বড় ভাই হিসেবে আমি কিছুটা সরে পড়েছিলাম'। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)। তিনি কি আসলে পরিবারের বিরোধ এড়াতেই সরে ছিলেন?

দলের দিক থেকে দেখলে, মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বেশ দায়িত্বশীল 'বড় ভাই' বলতে হবে। মহাসচিব হিসেবেও তিনি দলের মধ্যে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন, বলতে হবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যতদিন জীবিত ছিলেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদটি ছিল তার মর্জিমাফিক। যাকে খুশি, যখন খুশি মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ বা অব্যাহতি দিয়েছেন। মহাসচিবরাও তাদের দৌড় সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। ফলে এরশাদ যা চেয়েছেন, যেভাবে চেয়েছেন, মহাসচিবরা সেটাই করেছেন। নিজস্ব মত বলতে কিছু ছিল না। তবুও এইচএম এরশাদের মহাসচিবভাগ্য খারাপ বলতে হবে।

জাতীয় পার্টি যতবার ভাঙনের সম্মুখীন হয়েছে, নিষ্ফ্ক্রান্ত অংশে নেতৃত্ব দিয়েছেন কোনো না কোনো মহাসচিব। আশির দশকের মাঝামাঝি গঠিত এই দল অন্তত চারবার বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়েছিল। এর মধ্যে তিনবারের ভাঙন বহুল আলোচিত। নব্বইয়ের দশকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একবার ব্রাকেটবন্দি জাতীয় পার্টি গঠন করেন আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন করা না করার প্রশ্নে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোটে থাকা না থাকা নিয়ে আরেকটি জাতীয় পার্টি গঠন করেন নাজিউর রহমান মঞ্জুর। আর সর্বশেষ ২০১৩ সালে ২০ দলীয় জোটে আলাদা জাতীয় পার্টি নিয়ে যোগ দেন কাজী জাফর আহমেদ। সবাই জানেন, তারা তিনজনই ছিলেন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মহাসচিব। কিন্তু অনেকেই যেটা ভুলে যান, আরেকটি ব্রাকেটবন্দি জাতীয় পার্টি গঠন করা ডা. এমএম মতিন ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব।

এসবই এখন অতীত। অনেকে বলতেন, নেতা হিসেবে এরশাদের অস্থিরমতির কারণে রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টি থিতুই হতে পারেনি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতনের পরও তিনি যেভাবে বারংবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিনি বা তার দলের খণ্ডাংশ পরবর্তী প্রায় সব ক'টি সরকারের অংশ হতে পেরেছে, তা বিস্ময়কর। বিশ্বের আর কোনো দেশে ক্ষমতাচ্যুত সেনাশাসক এতটা ভাগ্যবান হতে পেরেছেন বলে জানা নেই। অনেকে বলেন, তিনি যদি কোনো জোটে বা সরকারে যোগ না দিতেন, তাহলে হয়তো জাতীয় পার্টি এভাবে বারংবার ভাঙত না। এমনকি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পর দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার সত্যিকারের স্বপ্নও দেখতে পারত। এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হলেও দলটির সামনে কি একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল?

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যখন অন্তত সাংগঠনিকভাবে বেকায়দায়, অপর একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী যখন বিপর্যস্ত; তখন জাতীয় পার্টির সামনে সুযোগ এসেছিল আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার। বিশেষত এরশাদ যখন নেই, তুলনামূলক স্থিতধি বিবেচিত তার ছোট ভাই জিএম কাদের যখন নেতৃত্বে; তখন এমন আশাবাদ দুরাশা হতে পারত না। কিন্তু কাজটি যে সহজ নয়, দলটির সাম্প্রতিক নাটকীয়তায় আরেকবার প্রমাণ হলো।

জাতীয় পার্টির মধ্যে জিএম কাদের এবং রওশন এরশাদের যে বিভাজন, সেটাকে কেবল দলের চেয়ারম্যান বা সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার সাম্প্রতিক বিরোধ থেকে দেখলে চলবে না। দলে এইচএম এরশাদের নেতৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তার পরে কে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর, সেই প্রশ্ন বরাবরই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। ২০১৬ সালে একবার এরশাদ জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। কিন্তু রওশনের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে অল্পদিনের মধ্যেই তাকে সিনিয়ার কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন। যদিও জাতীয় পার্টিতে পদ যা-ই হোক, এরশাদের বাইরে আর কারও 'বেইল' ছিল না; চলতি বছর বয়সের ভারে ন্যুব্জ এরশাদ আবারও দলের নেতৃত্বে আরেক দফা পরিবর্তন করেন। প্রথমে রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ প্রদান করেন। পরে জিএম কাদেরকে করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। দেবর-ভাবির এই পুরনো বিরোধ এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও শেষ হয়ে যায়নি। দলের নেতার কবর কোথায় হবে- এ নিয়েও সিনিয়ার কো-চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বেনামে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। আর গত এক সপ্তাহে পার্টির সভাপতিত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনে বিপরীতমুখী চিঠি, স্পিকারের কাছে একই পদে দু'জনের সমর্থনপত্রের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, বিরোধ কমেনি বরং বেড়েছে। এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হলেও জাতীয় পার্টিতে শৃঙ্খলা ও নিয়মতান্ত্রিকতা ফিরে আসবে- এই আশা যারা করেছিলেন, তাদের ভাগ্যে জুটেছে গুড়েবালি।

জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে আপাত 'সমঝোতা' হয়েছে। জিএম কাদের অন্তত আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত দলটির চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা। চেয়ারম্যান যেমন দলের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদকে 'মনোনয়ন' দিয়েছেন, তেমনই বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে তার উপনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছেন খোদ চেয়ারম্যানকে। এরশাদের পুত্র শাদও পিতার শূন্য আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন সমঝোতার অংশ হিসেবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সমঝোতা কতদিন টিকবে?

এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টিতে এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগে সব জোটই জাতীয় পার্টিকে পেতে চাইত মূলত দলটির ভোটব্যাংক বিবেচনায়। সেই শক্তিতেই জাতীয় পার্টি দর কষাকষি করতে পারত। কিন্তু রংপুর অঞ্চলে এর একচ্ছত্র প্রভাব এরশাদের মৃত্যুর পর কতখানি টিকে থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে এবং নির্বাচন যদি বগুড়া-৬ আসনের মতো হয়, তাহলে আগামী ৫ অক্টোবরেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

এটা স্পষ্ট, জিএম কাদেরের মূল শক্তি এখনও রংপুর। ওই এলাকার সন্তান হিসেবে সেখানকার নেতাকর্মীদের পছন্দের তালিকায় তিনি রওশনের ওপরে। আর ময়মনসিংহ অঞ্চলের এমপি ও নেতাকর্মীরাও রওশনের পাশে দাঁড়িয়েছেন সম্ভবত আঞ্চলিকতা বিবেচনায়। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ সম্ভবত যুযুধান দুই পক্ষ, দুই আঞ্চলিক ভোটব্যাংক- কোনো কিছুর ওপরই নির্ভর করছে না। হাওয়ায় শোনা যাচ্ছে, দুই পক্ষের সমঝোতা বৈঠকের নেপথ্যেও ছিল আসলে ক্ষমতাসীন দল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যদিও জাতীয় পার্টির বিরোধকে 'ঘরোয়া বিবাদ' আখ্যা দিয়েছেন, এটাই সত্য যে, জাতীয় পার্টির নিশ্চিত ভাঙন রোধ করেছে ক্ষমতাসীন দলই।

এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে- অনেকের এমন বিশ্নেষণের বিপরীতে আমি বলেছিলাম, অন্তত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি টিকে থাকবে। টিকে থাকতে হবে সংসদে একটি বিরোধী দলের প্রয়োজনের খাতিরেই। এর মধ্যে দলটি যদি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী না হয়, তাহলে ওই নির্বাচনের আগে-পরে কী ঘটবে, বলা মুশকিল।

এটা স্পষ্ট, রওশন এরশাদ ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট। বস্তুত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোলা মুশকিল। আবার বিএনপির বাইরে একটি বিরোধী দল যদি প্রয়োজন হয়, এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টির বিকল্প নেই। মুশকিল হচ্ছে, জাতীয় পার্টিকে সেই ভূমিকায় দেখতে চাইলে জিএম কাদেরকে লাগবে। সাংগঠনিক হিসেবে জিএম কাদের রওশনের চেয়ে অনেক 'ফিট'।

কথা হচ্ছে, জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক বিরোধ ও দূরনিয়ন্ত্রিত সমঝোতা যেমন রওশনকে তেমনই জিএম কাদেরকেও দিনের শেষে দুর্বলই করেছে। আপাত শক্তিশালী মনে হচ্ছে মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁকে। রওশন ও কাদের গ্রুপ- দুই পক্ষই মহাসচিব হিসেবে তার ওপর আস্থা রেখেছে। কিন্তু খোদ মহাসচিবের আস্থা কার ওপর সেটা কেউ জানে না।

আপাতত জাতীয় পার্টিতে হয়তো আরেকটি ভাঙন রোধ হয়েছে। কিন্তু দলটির দুই পা-ই যে মচকে গেছে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এরশাদ-পরবর্তী সময়ে দলটির নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দৃশ্যত তিরোহিত হয়েছে।

skrokon@gmail.com

লেখক ও গবেষক