নূর হোসেনের আত্মত্যাগ ও রাঙ্গাঁর ঔদ্ধত্য
আবু সাঈদ খান
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৭
গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম অঙ্গীকার। পাকিস্তান আমলজুড়ে
আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। বাংলাদেশের সংবিধানেও তার প্রতিফলন
রয়েছে। চার রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অন্যতম হচ্ছে গণতন্ত্র। দুর্ভাগ্যজনক,
স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংবিধানবন্দি হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব
হতে থাকে। একসময় লুণ্ঠিত হয়ে যায়। ক্ষমতার সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠে সামরিক
জান্তা। এভাবেই ক্ষমতায় আসীন হন জেনারেল জিয়াউর রহমান। কিন্তু তাকে রুখে
দাঁড়ায় না আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ
সেই সময়ের রাজনৈতিক দলগুলো। উপরন্তু রাজনৈতিক দলগুলো জিয়াউর রহমানের দেওয়া
নির্বাচনী ফাঁদে পা দেয়। ফলে বৈধতার আলখাল্লায় ঢাকা পড়ে যায় জিয়ার পরিহিত
সামরিক উর্দি। কথায় বলে, ন্যাড়া দু'বার বেলতলায় যায় না। রাজনৈতিক দলগুলো
দ্বিতীয়বার ফাঁদে পা দেয় না। ১৯৮২-এর ২৪ মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের কাছ থেকে জোরপূর্বক
ক্ষমতা দখল করেন। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল এরশাদের অপসারণের দাবিতে
রুখে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগসহ ১৫ দল (১৯৮৬-তে বিভক্ত হয়ে ৮ দল ও ৫ দলে পরিণত
হয়) এবং বিএনপিসহ ৭ দল। সেই সংগ্রামে একাত্ম হয় ছাত্র, শ্রমিক, সাংবাদিক,
উকিল, শিল্পী, লেখক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ১৯৮৩ থেকে
'৮৭- স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সেলিম,
দেলোয়ার, বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজ, ময়েজউদ্দিন, তাজুল, নূর হোসেন, ডা.
মিলনসহ অনেক শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের
একপর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন বুকে-পিঠে 'স্বৈরাচার নিপাত
যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক' পঙ্ক্তিমালা লিখে মিছিলে এসেছিলেন। স্বৈরশাসক
এরশাদের লেলিয়ে দেওয়া সরকারি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন তিনি। এক নূর হোসেনের
রক্তে লাখো নূর হোসেন জন্ম নেয়। আন্দোলন বেগবান হয়।
নূর হোসেনের আত্মদান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক মাইলফলক। তখন তার
আত্মত্যাগে আবেগাপ্লুত হয়েছিল সমগ্র জাতি। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন-
'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়'।
শহীদ নূর হোসেনসহ গণতন্ত্রের লড়াইয়ে বীর শহীদদের আমরা যথাযোগ্য মর্যাদার
আসনে বসাতে পারিনি; এটি আমাদের জন্য লজ্জার। তার চেয়ে লজ্জার ব্যাপার, আজ
শহীদ নূর হোসেনের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন
মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। গত ১০ নভেম্বর
জাতি যখন শহীদ নূর হোসেনকে স্মরণ করছে, বিভিন্ন সংগঠন 'নূর হোসেন' দিবস
পালন করছে, তখন জাতীয় পার্টির এক সভায় রাঙ্গাঁ বলেছেন, 'নূর হোসেন একটা
অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর ছিল। তাকে নিয়ে দুটি
গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নাচানাচি করছে।' ওই সভায় শেখ হাসিনা ও
খালেদা জিয়াকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।
রাজনীতিতে এক দল আরেক দল সম্পর্কে বলবে, বিতর্ক হবে- সেটি সংশ্নিষ্ট
দলগুলোর ব্যাপার। কিন্তু নূর হোসেন কোনো দলের নয়, তিনি জনগণের সম্পদ,
গণতন্ত্রের সৈনিক।
নূর হোসেনের জন্ম শ্রমিক পরিবারে। বাবা মজিবুর রহমান একজন রাজনৈতিক সচেতন
ব্যক্তি। আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সংগ্রামের মিছিলে
যোগ দিতেন। সবসময় দেশ ও সমাজের কথা ভেবেছেন তিনি। সেই বাবার আদর্শে গড়া
নূর হোসেন গণতন্ত্রের জন্য জীবন্ত পোস্টার হয়ে এখনও জ্বলছেন। এই চিরঞ্জীব
বীরের চরিত্র কালিমা লেপনের চেষ্টা আমাদের যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছে।

শহীদ
নূর হোসেনকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যের প্রতিবাদে ১১ নভেম্বর মা মরিয়ম
বিবিসহ পরিবারের ১২ জন সদস্য রাজধানীর প্রেসক্লাবে অবস্থান করেছেন। তারা
জাপা মহাসচিবের এই বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার বিচারের দাবি জানিয়েছেন। চোখের
জল ফেলতে ফেলতে মরিয়ম বিবি বলেছেন, 'আমার ছেলে কোনোদিন সিগারেট খেত না।
তাহলে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ কোন বিবেকে এমন কথা বলল? আমার ছেলে শহীদ হয়েছে, ও
জনগণের জন্য রাজপথে নেমেছিল, বড়লোক হওয়ার জন্য নয়।' এই অবমাননাকর
বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শরিক সাবেক
ছাত্রনেতারা। গত ১২ নভেম্বর সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য তীব্র
প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জাপা সদস্যরা বলেছেন, এটি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। দলের
মহাসচিবের বক্তব্য কী করে ব্যক্তিগত হয়? আর মহাসচিব দলের নীতি-বহির্ভূত
বক্তব্য দিলে তা কি সংগঠনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? এ বক্তব্যের জন্য নিন্দা
জানানোই যথেষ্ট নয়, সংসদে নিন্দা প্রস্তাব নেওয়াই ছিল সঙ্গত।
অবশেষে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে বিবৃতি দিয়েছেন।
নূর হোসেনের মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুখ ফসকে বেরিয়েছে।
কিন্তু জাপা নেতাদের মুখে শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ নতুন নয়। ইতোপূর্বে ডা. মিলন
সম্পর্কেও তাদের আপত্তিকর বক্তব্য শুনেছি। আর ক্ষমা চাইলেই কি ক্ষমা করা
যায়? শহীদমাতা ক্ষমা করলেও জনগণ তাদের ক্ষমা করতে পারে না, কখনও করবে না।
আমার জিজ্ঞাসা, এ ঔদ্ধত্য কোথায় পেলেন রাঙ্গাঁ সাহেব? এর জবাবও সবার জানা
আছে। রাঙ্গাঁ সাহেবরাও জানেন যে, তাদের নেতা স্বঘোষিত পল্লিবন্ধু জেনারেল
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাত সেলিম, দেলোয়ার, তাজুল, নূর হোসেন, ডা. মিলনসহ
শত শহীদের রক্তে রঞ্জিত, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল এবং সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে
অভিযুক্ত; তিনি কেবল পার পেয়েই যাননি। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কারাগারে যেতে হয়েছে
সত্য; কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিতে মহামূল্যমান ব্যক্তি হয়ে
ওঠেন। দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাকে নিয়ে দরকষাকষি শুরু করল। শেষ
পর্যন্ত উচ্চমূল্যে আওয়ামীবলয়ে তিনি অধিষ্ঠিত হলেন। ২০১৪ সালে মহাজোটে
জাতীয় পার্টি শরিক হয়ে একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করল।
কয়েকটি মন্ত্রিত্ব ও বিরোধী দলের নেতার পদ জুটল। স্বয়ং জেনারেল এরশাদ
মন্ত্রীর মর্যাদায় 'বিশেষ দূত' হলেন। সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু কোন
দেশের সঙ্গে কী দূতিয়ালি করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। আর ২০১৮ সালে
নির্বাচনের পর নিজেই সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। মঞ্জুর হত্যা মামলা
তাকে স্পর্শ করেনি। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষাবলম্বনের অপরাধও
তার পিছু নেয়নি। এরশাদ অবশ্য সংসদে দাঁড়িয়ে আফসোস করেছেন যে, তিনি ২৫ মার্চ
পাকিস্তানে থাকায় মুক্তিযুদ্ধে শরিক হতে পারেননি। তিনি পরিস্থিতি আঁচ করে
জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে নাকি দেখা করেছিলেন এবং তার পাকিস্তানে বদলির অর্ডার
হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। ওসমানী সাহেব তাকে পাকিস্তানে যাওয়ার অনুমতি
দিয়েছিলেন! অথচ জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা 'অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন
কান্ট্রি' বইয়ে (বইটি বাংলাদেশে ইউপিএল প্রকাশ করেছে) লিখেছেন, সৈয়দপুরে
থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডে ছিলেন লে. কর্নেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
(পরে লে. জেনারেল ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি)। ২৫ মার্চ রাতে কিছুক্ষণ
গুলিবিনিময়ের পর বাঙালি সেনারা অস্ত্র হাতে চলে যায়। বলা বাহুল্য, এরশাদ
ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। পরে পাকিস্তানে
বদলি হন। সেখানে তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা ও পালাতে উদ্যত
সৈনিক-অফিসারদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন বলে
অভিযোগ রয়েছে।
সে যাই হোক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুর্বলতাই এরশাদকে রাজনীতিতে নতুন জীবন
দিয়েছে এবং রাঙ্গাঁদের সৃষ্টি করেছে। জাতি একাত্তরের আবর্জনা সাফ করেছে,
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আবর্জনা এখনও
দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তা থেকে মুক্ত হওয়া জাতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংবাদিক ও লেখক
ask_bangla71@yahoo.com
- বিষয় :
- বলা না-বলা
- আবু সাঈদ খান