ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যৌন নিপীড়নের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি

যৌন নিপীড়নের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি
×

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২২ | ১২:০০

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাঁচজন ছাত্র মিলে একজন ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে যে উত্তাল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ, তা যে কোনো বিবেচনাতেই সমর্থনযোগ্য। শিক্ষার্থীদের দেওয়া চার দফা দাবি চার কর্মদিবসের মধ্যেই পূরণ করা হবে- এ মর্মে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীতিগতভাবে একমত। যে রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রী হেনস্তার ঘটনা ঘটে, তার পরদিনই প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে সব হলের প্রভোস্ট ও প্রক্টরিয়াল বডিকে নিয়ে জরুরি সভায় বসে। তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে 'শূন্য সহিষুষ্ণতা' ঘোষণা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকার করা হয়।

প্রশাসনের এ ত্বরিত ব্যবস্থা স্বাগত হলেও বিপত্তি ঘটে অন্য একটি সিদ্ধান্তে। খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না থাকলেও এ সিদ্ধান্ত ২০ জুলাই থেকে কার্যকরের কথা রটে যায়। দুই শতাধিক ছাত্রী ২০ তারিখ রাত ১০টায় নিজ নিজ হল থেকে বের হয়ে ভিসির বাংলোর সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

শিক্ষার্থীদের এ বিক্ষোভ পুরোপুরিই ন্যায্য। ছাত্রীকে হেনস্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে উল্টো ছাত্রীদেরই সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার চিন্তা ভিকটিমকে দায়ী করার শামিল। যেন ছাত্রীরা হলে প্রবেশ করলেই ক্যাম্পাসে যৌন নিপীড়ন বন্ধ হয়ে যাবে! যৌন নিপীড়নের অপরাধীদের শাস্তি বিধানের আগে উল্টো ভিকটিমকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরোনো রোগ। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিক্ষোভরত ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত চুক্তি করে তাঁদের হলে ফেরত পাঠায়। ক্ষোভ-বিক্ষোভের প্রতি প্রশাসনের সম্মান দেখানোর এ প্রচেষ্টা অভিনন্দনযোগ্য।

শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি হচ্ছে- ১. ক্যাম্পাসে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা চাই এবং হল থেকে বের বা হলে ঢোকার কোনো সময়সীমা থাকবে না; ২. বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেল ভেঙে নতুন করে কার্যকরী সেল গঠন করতে হবে এবং সব ঘটনার বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে (বিচারের ব্যবস্থা করার জন্য সর্বোচ্চ সময়সীমা এক মাস এবং যদি তা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেল স্বয়ং নিজের শাস্তির ব্যবস্থা করবে); ৩. যৌন নিপীড়ন সেলের চলমান কেসগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে আগামী চার কর্মদিবসের মধ্যে; ৪. আগামী চার কর্মদিবসের মধ্যে (এ ঘটনার) দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না হলে প্রক্টরিয়াল বডি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবে। 

বস্তুত একজন শিক্ষার্থী নিজের ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে- এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আবার ছেলে শিক্ষার্থীদের হাতে মেয়ে শিক্ষার্থীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়- এর চেয়ে লজ্জা, দুঃখ ও ঘৃণার আর কিছু নেই। আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী শিক্ষা দিচ্ছি? শিক্ষার্থীরা যেখানে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করবে তার ক্যাম্পাসে; সেখানে নিজের ক্যাম্পাসেই নিরাপত্তার শঙ্কার মধ্যে বাস করছে- এটা কোনোভাবেই একটি আদর্শ ক্যাম্পাসের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

প্রায় ২ হাজার ৩০০ একরের অনিন্দ্যসুন্দর ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৃতির অপরূপ সাজে পাহাড়ঘেরা এত সুন্দর একটি ক্যাম্পাস কিছু দুশ্চরিত্র শিক্ষার্থীর বিকৃত আচরণের কারণে আজ পুরো জাতির সামনে একটা নেতিবাচক ইমেজ নিয়ে হাজির হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমার জন্যও এটা অত্যন্ত লজ্জা ও অপমানের। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারছি না। নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নূ্যনতম মানবিক বোধ আমরা তাদের মধ্যে জাগাতে পারছি না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি, জাত-পাত, ভাষা, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমাজের সবার সমমর্যাদার সহাবস্থান নিশ্চিত করার শিক্ষা দেওয়া; সেখানে নারীকে, নিজ সহপাঠীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়! আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ঘটনায় তীব্রভাবে ব্যথিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী আছে। এখানকার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়া হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রশাসনের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য। বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্মের ওপর উল্লেখযোগ্য গবেষণার জন্য রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি একজন নারী। শিক্ষক সমিতির ১১ জন সদস্যের মধ্যে চারজন নারী সদস্য। প্রক্টরিয়াল বডিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আছেন একজন নারী সহকারী প্রক্টর। তাই আমরা আশা করি, এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে যৌন নিপীড়নবিরোধী ও যৌন নিপীড়নমুক্ত এবং এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধানের মাধ্যমে সেটার যাত্রা শুরু হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের 'উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ নীতিমালা ২০০৮'-এর ৫.২ ধারা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি 'যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র' আছে। ২০১৮ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনার জন্য একটি 'অভিযোগ কমিটি' আছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যাক্ট অনুযায়ী একটি 'ডিসিপ্লিনারি কমিটি' আছে। তা ছাড়া এ ঘটনার পরপরই প্রশাসন দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার শর্ত দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আমরা জানতে পেরেছি, চারটি কমিটিই দফায় দফায় সভা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দোষীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে এবং অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধানের আন্তরিক চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, এ ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটা সুন্দর নজির স্থাপন করবে।

সর্বশেষ খবর, নিপীড়িকদের চারজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে দু'জন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের, আর দু'জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ডিসিপ্লিনারি কমিটি ২৩ জুলাই জরুরি বৈঠক ডেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত দু'জনকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকেও আজীবন বহিস্কারের জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবে। দ্রুততম সময়ে এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্তের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ পেতে পারে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×