ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

আত্মসাতের অতিমারিতে এমদাদের অনুশোচনা

আত্মসাতের অতিমারিতে এমদাদের অনুশোচনা
×

শেখ ইউসুফ হারুন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৫:৪২

সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ- দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন অবসরপ্রাপ্ত সিপাহি মো. এমদাদুল হক (৬৫) গত ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে গিয়ে 'বকেয়া' রেল ভাড়া বাবদ ২ হাজার ৫৩০ টাকা পরিশোধ করেছেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি যতবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ঢাকা ভ্রমণ করেছেন, বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়েছেন। অবসর গ্রহণের পর অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে 'আত্মসাৎ' করা সেই অর্থ ফেরত দিতে চেয়েছেন। সিপাহি পদমর্যাদার একজন ব্যক্তির এ রকম অনুশোচনা হলেও দেশের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি এভাবে বিবেকের তাড়নায় দগ্ধ হন না। অনেক প্রভাবশালীর আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত বিনা টিকিটে দাপটের সঙ্গে রেল ভ্রমণ করেন। রেলের কর্মকর্তারাও তাঁদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারেন না। তাঁরা নিজেদের সব আইনকানুনের ঊর্ধ্বে মনে করেন।

বিনা টিকিটে রাষ্ট্রীয় পরিবহনে ভ্রমণ আমাদের সমাজের প্রাচীন ব্যাধি। স্বাধীনতার পরে খুলনা থেকে পাইকগাছা যাওয়ার একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল লঞ্চ। ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় খুলনা থেকে পাইকগাছায় নানাবাড়ি যাচ্ছিলাম। আমার পিতা লঞ্চের টিকিট কেটে কেরানিকে (লঞ্চের টিকিট কালেক্টর) বলে দিলেন- সঠিকভাবে যেন আমাকে বোয়ালিয়া ঘাটে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমি জড়সড় হয়ে লঞ্চের 'আপার ক্লাস'-এর এক কোনায় বসে থাকলাম। এমন সময় আমারই বয়সের একটি ছেলেকে তার আত্মীয় লঞ্চে তুলে দিলেন। 'বেলবটম প্যান্ট ও হিলওয়ালা জুতা' ছেলেটিকে মানিয়েছে বেশ। পাজামার ওপরে 'হাফ স্লিভ শার্ট' আর পায়ে চটি পরা আমার দিকে এক ধরনের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, আমি চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। বটিয়াঘাটা ঘাট পার হওয়ার পর কেরানি এলে আমি টিকিটটি বের করে দিলাম। ছেলেটি টিকিট কাটেনি; কেরানির চাপাচাপিতে কাটতে বাধ্য হলো। গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর পর দেখলাম, তার পিতা লঞ্চঘাটে উপস্থিত। ছেলেটির অনুযোগ- 'বাবা, কেরানি আমার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন।' পিতা বললেন- 'আমার পরিচয় দিসনি!'

পিতা-পুত্রের সংলাপটি তখন আমার কাছ অভিনব মনে হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হয়- এটিই বাস্তব। বিভিন্ন পরিচয়ের প্রভাবে রাষ্ট্রের অর্থ মেরে দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। অন্যের অর্থ আত্মসাতের এক অতিমারি চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ কথা ঠিক, যিনি যত ক্ষমতাবান, তিনি রাষ্ট্রের তত টাকা মেরে দিয়েছেন। আর ক্ষমতাহীন হলো রাষ্ট্রের জনগণ, যাদের ট্যাক্সের টাকায় ক্ষমতাবানরা আরাম-আয়েশ করছেন।

২০১২ সালে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক থাকাকালে সিভিল সার্ভিসের জন্য মর্যাদাপূর্ণ 'সুপারম্যাট' প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য বার্মিংহামের উলভারহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণ শেষে 'শেনজেন' তালিকাভুক্ত কিছু দেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্যারিস হয়ে বার্লিন যাই। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহবুব অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্টে উপস্থিত। সস্ত্রীক আমি ও মাহবুব রেলস্টেশনে গিয়ে টিকিট কাটার জন্য ৫০ ইউরোর একটি নোট টিকিট ভেন্ডিং মেশিনে দিই। আমাদের গন্তব্যের ভাড়া জনপ্রতি ১৫ ইউরো করে মোট ৪৫ ইউরো। কিন্তু টিকিট পাওয়ার পর মেশিনটি ৫ ইউরোর পরিবর্তে আমাকে ৫০ ইউরোর কয়েন ফেরত দিল। আমি তো অবাক! মাহবুব বলল, আগামীকাল ওদের হেড অফিসে গিয়ে কয়েন ফেরত দেওয়া যাবে। পরদিন আমরা বার্লিন টিভি টাওয়ারের নিচে ট্রেনের টিকিট ক্লার্কের কাছে গিয়ে ঘটনা খুলে বলে কয়েনগুলো ফেরত দিতে চাইলাম। অবাক ভদ্রমহিলা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন- 'এটা কখনও ঘটবে না। মেশিন ভুল করতে পারে না।' আমি বললাম, তাহলে আমাদের কী করা উচিত? তিনি দোতলায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠালেন। তিনিও একই কথা বললেন। সব শেষে বললেন- 'আপনার কাছ থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।' আমি হতাশ হয়ে মাহবুবকে বললাম, ৫০ ইউরো যাতে কোনো গরিব ছাত্রকে দিয়ে দেয়।

এমদাদুল হক তাঁর বিনা টিকিটে অতীতে ট্রেন ভ্রমণের টাকা বর্তমানকালে পরিশোধ করতে পেরেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের বুকিং সহকারীর সহযোগিতায়। পশ্চিমা বিশ্বে এটি কখনোই সম্ভব হতো না। স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী তাঁর অফিসে বসিয়ে এমদাদুল হককে আপ্যায়ন করে ধন্যবাদও দিয়েছেন। এমন সহযোগিতাও বিরল। তিনিও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

এদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শত শত আমানতকারীর টাকা আত্মসাৎ করছেন একশ্রেণির শিল্পপতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হয়ে জমি ক্রয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে এমএলএম কোম্পানি বা মাল্টিপারপাস সমিতি খুলে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করতে দেখেছি। তার সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা। তারা গ্রাহকের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের প্রলোভন দিয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। সব ক্ষেত্রে যেন টাকা আত্মসাতের এক মহাযজ্ঞ চলছে। যে যেভাবে পারছেন, অন্যের টাকা মেরে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন।

অনেককে বলতে শুনি, বর্তমানের তরুণরাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা সে বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছেন। যাঁরা এ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা বয়সে তরুণ হলেও টাকা আত্মসাতের দক্ষতায় বড় বড় প্রতারককেও হারিয়ে দিয়েছেন।

জনগণের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও তাঁদের অনুশোচনা হয় না।

একজন এমদাদুল হক অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে বিনা টিকিটে ভ্রমণের মূল্য হিসাব করে সেই অর্থ ফেরত দিলেন। এমন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নিজের বিবেকের সঙ্গে তাঁকে কত বড় যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল, তা একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন। এটি এত সহজ কাজ নয়। তিনি লোকলজ্জা ও সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে তিলে তিলে দগ্ধ করে এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতো অনেকে হয়তো তাঁদের অতীত কুকর্মের কথা স্মরণ করে প্রতিকার করতে চান। কিন্তু আইন, সামাজিক অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার কথা বিবেচনা করে তাঁরা সেটি করতে পারেন না। এমদাদুল হক সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে সেটি করতে পেরেছেন। এ জন্য তাঁকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ।

আশা করতে পারি- রাষ্ট্রের ও জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীরাও সিপাহি এমদাদুলের কাছ থেকে শিক্ষা নেবেন এবং আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত দেবেন।

শেখ ইউসুফ হারুন: নির্বাহী চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

আরও পড়ুন

×