সমকালীন প্রসঙ্গ
চতুর্দিকে পঞ্চগড়
নূরুননবী শান্ত
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৩ | ১৮:০৬
স্বাধীনতার মাস মার্চের প্রথম দিন এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু একখণ্ড রাষ্ট্র পাইনি। ওই সময় রক্তগঙ্গার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, এই রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক নয়; অসাম্প্রদায়িক হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের নিজেদের চরিত্র স্ববিরোধী। গুজরাটের দাঙ্গার সময় যাঁরা এই দেশের প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক মানুষ তাঁরাও ভেবেছেন যে, গুজরাটে সেক্যুলার সরকার থাকলে এই অবস্থা হতো না। অর্থাৎ, ভারতে দাঙ্গা লাগলে সেক্যুলার হয়ে যাই, কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেক্যুলার থাকি না; সাম্প্রদায়িক হয়ে যাই।’ একই অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে ধর্মনিরপেক্ষতা চেয়েছিলেন, সেটা থেকে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।’ আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের লেখা বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং নাফিসা বানুর লেখা বঙ্গবন্ধু, শুদ্ধাচার, নারীর ক্ষমতায়ন ও অন্যান্য বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তাঁরা।
এর ঠিক দু’দিন পরই পঞ্চগড়ের ‘সালানা জলসা’কে কেন্দ্র করে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহতম সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে! সংবাদমাধ্যমে এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যতটুকু এসেছে, তা নিমজ্জিত হিমশৈলীর দৃশ্যমান চূড়ামাত্র। শুধু ভিন্নবিশ্বাসের কারণে মানুষ কতখানি দলবদ্ধ নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হতে পারে; সে চিত্র না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। যা ঘটেছে, তার জন্য লজ্জিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
শুধু পঞ্চগড় নয়; আমরা উত্তরবঙ্গবাসী এই চিত্র এমনকি কল্পনাও করতে পারতাম না। সম্প্রদায়ের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলাবলি ছিল না, তা নয়। কিন্তু সম্প্রীতির পরিবেশ ছিল। বৈপরীত্যের মধ্যেও মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব ছিল, সম্প্রীতি ছিল। পঞ্চগড়ের কাদিয়ানিদের সঙ্গে স্থানীয় অপরাপর মুসলমানের আত্মীয়তায় কোনো বাধা ছিল না। তবে সময়ের ফাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মবিশ্বাস অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে; সারাদেশের প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
এ দেশের চাঁদে যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে দেখা যায়; ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম জ্বালানো হয়; আদিবাসীদের হত্যা করা হয়; ধর্মগ্রন্থ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মানুষ মারা হয়। এমনকি স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও সাম্প্রদায়িক উস্কানি থাকে। সাম্প্রদায়িকতা নারীর পোশাক, কপালের টিপ, যাত্রাপালা, পহেলা বৈশাখের উৎসব, বিশ্বঐতিহ্যের উপাদান বাউল গানকে ছাড়ে না। সাম্প্রদায়িকতা সাধুসঙ্গে হামলা করে; কবিগানকে স্তব্ধ করে; শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে প্রভাবিত করে। এমনকি বাল্যবিয়ে রোধেও প্রতিবন্ধক হিসেবে আবির্ভূত। সব প্রগতি থামিয়ে দিয়ে ধনতান্ত্রিক, বৈষম্যপূর্ণ, বিদ্বেষে ভরা বাংলাদেশ কায়েম করতে চায়। সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করাতে পারে; সামাজিক মাধ্যমে অব্যাহত উস্কানি ছড়াতে পারে। এমনকি মসজিদের মাইক ব্যবহার করে গুজব রটিয়ে সমাজের সংহতির ওপর বিষ ঢেলে দিতে পারে। ভয় লাগে! অপরাধী চিহ্নিত করা ও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় ভয় বাড়ে।
সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া এবং এর ধারাবাহিকতায় ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শাস্তির তালিকা করতে পারলে নিশ্চয় বলা যেত– এই ‘রক্তগঙ্গার মাধ্যমে’ অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটি অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনে সক্রিয়! কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, সেই বাংলাদেশ থেকে ‘আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।’ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও সাম্প্রদায়িকতা-অসাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নের সুরাহা হয় না। এর প্রভাব পড়ে সমাজে; সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে। তাদের সহিষ্ণুতা লোপ পায়। হাজারো মানুষ মিলে ভিন্নমতের মানুষের ওপর নিষ্ঠুর আক্রমণ চালাতে তারা উৎসাহ বোধ করে।
পঞ্চগড়ে সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তো নতুন নয়। প্রতি বছর আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সালানা ঘিরে এখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ– সবার মধ্যস্থতায় সালানা জলসা হয়ে থাকে। অথচ এবার পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষই মনে করছে– কেউ নাকি বুঝতেই পারেনি এমন দলবদ্ধ সহিংসতা ঘটতে পারে! পঞ্চগড়ের আহমদনগর, বোদার ফুলতলা, শালশিড়ি, সোনাচান্দি– সব গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, ভেঙেচুরে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। লুট করা হয়েছে বাড়ি ও দোকানপাট। এসব করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে। নদীর ওপার থেকেও ভিনগাঁয়ের লোকজন দলে দলে এপাড়ে এসে আহমদিয়াদের ওপর আক্রমণ করেছে। ঘটেছে মানবতার করুণ অধঃপতন।
কেন বোঝা যায়নি পরিস্থিতি? প্রশাসনের কাছে মুসল্লিদের পক্ষ থেকে আবেদন দেওয়া হয়েছিল আগেই– আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সালানা জলসা যেন বন্ধ করা হয়। সেদিন থেকেই ফেসবুকে অপপ্রচার চলেছে। তাহলে কেন সহিংস হামলার আশঙ্কা আমলে নেওয়া হয়নি? সাধারণ মানুষ মনে করে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবশ্যই প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রস্তুতি ছিল না কিংবা তাঁরা আহমদিয়াদের নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা দেখিয়েছেন।
পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এলেও; শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও সমাজের মানুষের মন থেকে আশঙ্কা দূর হয়নি। ইতোমধ্যে যাঁদের মৃত্যু হলো, তাঁদের পরিবার কি কোনোভাবে শান্তি ফিরে পাবে? বেশ কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও গ্রুপ থেকে এখনও আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর প্রয়োগ তো দেখা যাচ্ছে না! কিংবা সত্যিই কি শুধু আইন দিয়ে সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার শিকড় উপড়ানো সম্ভব? সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতি বিকাশের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা থেকে বাংলাদেশের মুক্তি নেই। দূর করতে হবে কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি। নইলে সমাজে সুঁই হয়ে প্রবেশ করা সাম্প্রদায়িকতা কখন রাষ্ট্র কাঠামোয় ফাল হয়ে উঠবে, আমরা বুঝতেই পারব না।
কবি ফিরোজ এহতেশামের ভাষায় অনুনয় করে বলতে চাই– ‘চতুর্দিকে পঞ্চগড়/ তুমি আপন আমি পর/ তবু/ সেবা আর শুশ্রূষার/ চূড়ান্ত বেদনার ভার/ আমি তোমাকে দিলাম/ পরিচর্যা করো ধীরে ধীরে।’
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- নূরুননবী শান্ত