ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অধিকার

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনজাতি

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনজাতি
×

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ একটি মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে দেয়। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য– Indigenous Youths as Agents of Change for Self-determination, যার বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে– ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় আদিবাসী তরুণরাই মূল শক্তি’। এটি একেবারে আক্ষরিক না হলেও মর্মার্থগতভাবে মূল প্রতিপাদ্য। এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ’ অনুযায়ী একটি স্বীকৃত মানবাধিকার। এ ছাড়া ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত ‘আদিবাসী অধিকার সনদ’-এর ৩ নম্বর ধারায়ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী বিশ্বের সব মানুষ সব মানুষের কাছে সমান, সেহেতু আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পৃথিবীর দেশে দেশে ন্যাশনাল মেজরিটির আছে, কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেই– এটা কখনও হতে পারে না। আন্তর্জাতিক আদিবাসী অধিকার সনদ অনুযায়ী যেহেতু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, সেহেতু পৃথিবীর সব আদিবাসী জনগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে।

২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে পুনরায় সামনে আনা হয়েছে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় আদিবাসী তরুণ সমাজকে এগিয়ে এসে নিজেদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে সক্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় জোরদার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। মূল প্রতিপাদ্য সামনে রেখে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ রূপান্তরের (ক্লাইমেট অ্যাকশন ও গ্রিন ট্রানজিশন) কথা বলা হয়েছে। কেননা, বিশ্বব্যাপী জমি, জল, জঙ্গল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মৌলিক জীবনাচারের অংশ এবং জীবিকার প্রধান উপকরণ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে তরুণ আদিবাসীদের সবুজ রূপান্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য তীব্র তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সম্পৃক্তকরণ (মোবিলাইজেশন অব জাস্টিস), যার মাধ্যমে বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের যে গ্লানিকর ইতিহাস আছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং আদিবাসী তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তৃতীয়ত, আন্তঃপ্রাজন্মিক যোগাযোগ (ইন্টারজেনারেশনাল কমিউনিকেশন), যার মাধ্যমে বয়স্কদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের তারুণ্যদীপ্ত প্রাণশক্তির সমন্বয়ে একটি সুন্দর আন্তঃপ্রাজন্মিক যোগাযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যেখানে তরুণ আদিবাসীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৭৬ মিলিয়ন আদিবাসী ৯০টি দেশে বসবাস করে। তারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশেরও কম, কিন্তু পৃথিবীর সব দরিদ্র জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ হাজার স্বতন্ত্র ভাষায় আদিবাসীরা কথা বলে, যা প্রায় ৫ হাজার আদিবাসীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আজ ৯ আগস্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করবে। এ দিবসে আদিবাসীরা যেমন তাদের বিচিত্র সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপস্থাপন করবে, তেমনি নিজেদের শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ইতিহাসও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে। এভাবেই বিশ্বব্যাপী আদিবাসী দিবস পালিত হয়ে আসছে ১৯৯৪ সাল থেকে, যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৯/২১৪ রেজুলেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৯ আগস্টকে আদিবাসী দিবস ঘোষণা করার পেছনের যুক্তি– ১৯৮২ সালের এই দিনেই জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অব ইনডিজেনাস পিপলসের প্রথম সভা হয়। ফলে ১৯৯৪ সাল থেকে ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবসরূপে পালিত হয়।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আদিবাসী দিবস পালন করা হয়, তবে বেসরকারি পরিসরে। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আদিবাসী অধিকার সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিল। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেনি। ফলে রাষ্ট্রীয় বা সরকারিভাবে বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস পালিত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, উত্তরবঙ্গের বাংলাদেশ আদিবাসী পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসীদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা কিছু বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস পালন করে। নানা আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস পালনে থাকে আদিবাসী নৃত্য, বৈচিত্র্যময় র‍্যালি, আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও সেমিনার। এই দিনে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাছে তাদের দুঃখ-দুর্দশা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বেদনা-বঞ্চনা, অত্যাচার-নিপীড়ন এবং চাহিদার বিষয়-আশয় উপস্থাপন করে।

আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমতলের জন্য একটি স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার সমাধানে গঠিত ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা, সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ-সুনামগঞ্জের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধান, মধুপুর-ভাওয়াল অঞ্চলের গারো আদিবাসীদের জীবনাচার বিনষ্ট করে ইকোপার্ক স্থাপনে আদিবাসী সংস্কৃতিকে পণ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া বন্ধ, উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৮টি জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভিটামাটি রক্ষা, ভূমিদস্যুদের হাত থেকে জীবন-জীবিকা সুরক্ষা প্রভৃতি দাবি নিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী সংগঠনগুলো দিবসটি পালন করে। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে এসব দাবি উচ্চারিত হয়। কিন্তু এর কোনোটার সন্তোষজনক সুরাহা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তাই এ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘোচাতে আদিবাসী তরুণদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের আদিবাসী তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। আমরাও চাই বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। আমরাও চাই বাংলাদেশ হয়ে উঠুক বহু জাতি-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি-চিন্তার মানুষের সমমর্যাদা ও সহাবস্থানের এক বৈচিত্র্যময়, উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×