ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারত-পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়, সিনেমার মতই ছিল তার জীবন

ভারত-পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়, সিনেমার মতই ছিল তার জীবন
×

নূর জাহান ১৯৩০-এর দশকে ভারতে শিশুশিল্পী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আর্কাইভস

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৩৪ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৩:০৩

নূরজাহান। অভিনয়, গান ও চলচ্চিত্র নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। দেশভাগের আগে ভারতের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা নূরজাহান পরে পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।

ভারতে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পাকিস্তানের লতা মঙ্গেশকর’ নামে। আর পাকিস্তানে ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মালিকা-এ-তারান্নুম’—সুরের রানি।

১৯৩০-এর দশকে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন নূরজাহান। শৈশব কেটেছে বাংলায়। পরে তরুণ বয়সে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যান। ১৯৪২ সালের ‘খানদান’ সিনেমায় অভিনয় করে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান তিনি। ছবিতে তার সঙ্গে ছিলেন প্রাণ।

‘খানদান’ নূরজাহানকে এমন জনপ্রিয়তা এনে দেয়, যা সে সময়ের অনেক অভিনেত্রী অর্জন করতে পারেননি। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের গান নিজে গাইতেন তিনি। সৌন্দর্য, অভিনয় ও কণ্ঠ—তিন মিলিয়ে দর্শকের কাছে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

এই সিনেমার পরিচালক শওকত হুসেন রিজভির সঙ্গে নূরজাহানের সম্পর্কও গড়ে ওঠে। প্রথমে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন ছবির প্রযোজক দালসুখ এম পাঞ্চোলি। পরে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত নূরজাহান নিজে আদালতে গিয়ে রিজভিকে নিজের ভাইয়ের মতো বলে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে পরে পরিবারের আপত্তির মধ্যেই রিজভিকে বিয়ে করেন তিনি।

লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে নূর জাহান ও গোলাম হায়দার। ছবি: এক্সপ্রেস আর্কাইভস

এরপর বোম্বের একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন নূরজাহান। দিলীপ কুমারের সঙ্গে ‘জুগনু’ ছিল তার উল্লেখযোগ্য কাজ। অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ হওয়ায় দ্রুতই তিনি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হয়ে ওঠেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নূরজাহান পাকিস্তানে চলে যান। তিন বছর পর, ১৯৫০ সালে তিনি ‘চাঁন ওয়ে’ সিনেমা পরিচালনা করেন। সিনেমাতে অভিনয়ের পাশাপাশি গানও গেয়েছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন নূরজাহান। ছবিটিও সে সময় বড় সাফল্য পায়।

১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে বিয়ে করেন নূরজাহান। এই সংসারে তার আরও তিন কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। এজাজের ইচ্ছায় ১৯৬১ সালে অভিনয় ছেড়ে দেন তিনি। এরপর পুরোপুরি সংগীতে মন দেন।

অভিনয় ছাড়ার পর তার সংগীতজীবন আরও বিস্তৃত হয়। উর্দু ও পাঞ্জাবি গানে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দেশের বাইরে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন।

নূরজাহানের দৃঢ় ব্যক্তিত্বের একটি ঘটনাও তার মেয়েরা স্মরণ করেছেন। তার মৃত্যুর ২০ বছর পূর্তিতে মেয়ে হিনা দুররানির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক ভিডিওতে তিন মেয়ে মায়ের কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন।

পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সময় নূর জাহান। ছবি: দ্য ইডিয়ান এক্সপ্রেস

তাদের একজন জানান, একবার এক চলচ্চিত্র প্রযোজক নূরজাহানের রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঢুকে তাকে নিজের ছবির জন্য গান গাইতে বলেন। ওই ছবিতে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন বলেও দাবি করেন প্রযোজক। নূরজাহান তখন উঠে গিয়ে তাকে কান ধরে স্টুডিও থেকে বের করে দেন। ঘটনাটি দেখে সেখানে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যান।

দ্বিতীয় বিয়ের কঠিন সময়ের মধ্যে তিন মেয়েকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়েছিলেন নূরজাহান। সন্তানদের পারিবারিক অস্থিরতা থেকে দূরে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি বলে জানা যায়।

জীবনের শেষ ছয় বছর পাকিস্তান, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন নূরজাহান। সন্তানরা শেষ সময় পর্যন্ত তার পাশে ছিলেন। মৃত্যুর আগে নিজের অধিকাংশ সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়।

১৯৮২ সালে দেশভাগের পর প্রথম এবং একমাত্রবার ভারতে যান নূরজাহান। ভারতে পা রাখার মুহূর্তটি ছিল তার জন্য আবেগঘন। দিলীপ কুমারের সঙ্গে দূরদর্শনের এক অনুষ্ঠানে ১৯৪০-এর দশকে একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতিও তুলে ধরেছিলেন তিনি। ভারতে যাওয়ার পর বলিউডের অনেক তারকা তাকে স্বাগত জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও।

১৯৯৬ সালে শেষবারের মতো গান রেকর্ড করেন নূরজাহান। তবে তার কণ্ঠের জনপ্রিয়তা আজও কমেনি। ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে তার গান এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। ২০০০ সালে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান উপমহাদেশের এই কিংবদন্তি শিল্পী। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

আরও পড়ুন

×