পোশাকে পটচিত্র
মডেল: হুমায়রা ও তুর্নি; ছবি: হরীতকী
আসমাউল হুসনা
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
ফ্যাশন সচেতন মানুষ সব সময় নতুন কিছুর খোঁজ রাখেন। নতুন পোশাক, পোশাকের নতুন কাট, নতুন নকশা ইত্যাদি খেলা করে তাদের মাথায়। ঠিক পোশাকের নকশাকারদের মাথায়ও বিভিন্ন ভাবনা-চিন্তা উঁকি দেয়। তা থেকেই হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। জন্ম নেয় নতুন কিছুর। পোশাক ডিজাইনের ক্ষেত্রে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, দেশীয় উপকরণগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এখন অবশ্য জীবনযাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছু উঠে আসে পোশাকের ডিজাইনে। চায়ের কাপ, ধোঁয়া ওঠা চা, কফি, বর্ষাকাল, জাদুর শহর, ব্যাঙ, ব্যাঙাচি ইত্যাদি। গরমে পরার জন্য পোশাকে পটচিত্র নিয়ে এসেছে অনলাইন পেজ হরীতকী, কইন্যাসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
অনেক আগে থেকেই পটচিত্রের পোশাকের কদর রয়েছে। এখনকার তরুণরাও পোশাকে পটচিত্র গ্রহণ করছে। পোশাকে ফুল-পাতার নকশা নতুন কিছু নয়। তবে শাড়িতে অথবা কামিজ-কুর্তিতে যখন একটি গল্প প্রকাশ পায়, তখন সেটি অবশ্যই ভিন্ন কিছু।
সংস্কৃত ভাষায় কাপড়কে বলা হয় পট্ট। পট্ট শব্দ থেকে পট শব্দের উৎপত্তি। পটের ওপর রংতুলির ছোঁয়ায় যে চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়, তা-ই পটচিত্র।
পটচিত্র বাংলার ঐতিহ্য। প্রাচীন বাংলায় যখন কোনো দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি, তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। তখনকার সময় পটচিত্র আঁকতে রং হিসেবে ব্যবহার করা হতো দেশজ রং। ইটের গুঁড়া, কাজল, লাল সিঁদুর, সাদা খড়ি, আলতা, কাঠকয়লা ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। পটটিকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে কাজ করা হতো এবং রঙের প্রকারের মধ্যে লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, বাদামি, সাদা এবং কালো ব্যবহৃত হতো।
বিষয়-বৈচিত্র্য অনুসারে সংগৃহীত পটগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন– চকসুদন পট, যমপট, সাহেবপট, কালীঘাট পট, গাজিপট, সত্যপীরের পট, পাবুজীপট, হিন্দুপ্রাণ পট ইত্যাদি। সাধারণভাবে পটকে ছয় ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলো হলো– বিষয় নিরপেক্ষ, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং পরিবেশগত। এসব পটচিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কালীঘাটের পটচিত্র। এটি বাঙালির নিজস্ব শিল্প অভিব্যক্তির এক বিশেষ প্রকাশ। উনিশ শতকে কলকাতার কালীমন্দিরের বাজারেই এটি বিকাশ লাভ করে। তখন এটি শুধু তীর্থপণ্য হিসেবে বিকিকিনি হতো। তাই শিব, রাম-সীতা, দুর্গা, কালী এসবই ছিল পটের বিষয়। বালুর মিলে তৈরি চৌকো কাগজে আঁকা হতো এসব পট, যা চৌকস নামেও পরিচিত ছিল। চাল, ডাল, সবজি, পয়সার বিনিময়ে এসব পটচিত্র বিক্রি হতো। আলতানুটি ও গোলেলের জাদু কালীঘাট পটশৈলীকে বিশেষত্ব দিয়েছে। আলতানুটি হলো তুলি, যা দিয়ে আলতা পরানো হতো। গোলেল হলো ডৌলতার পর্দা বা টোন।
পরবর্তী সময়ে পটচিত্রশিল্পী, অর্থাৎ পটুয়ারা কালীঘাটে পটচিত্রের গোড়ার দিকের বিষয়বস্তু থেকে বেরিয়ে এসে রংতুলিতে ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘ঘরে ছুঁচোর কেত্তন আর বছরে কেঁচোর পত্তন’সহ নানা গল্প ফুটিয়ে তোলেন।
কালের সেই ধারা অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। কাগজে আঁকা সেই চৌকস পটচিত্র ঠাঁই পেয়েছে এখন পোশাকে। দেশজ রঙের পরিবর্তে ডিজিটাল প্রিন্টের ছোঁয়ায় পটচিত্রগুলো আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। নানা কল্পকথায় খুব সুন্দরভাবে সাজানো হচ্ছে শাড়ির পাড়, আঁচল, জমিন, টপস, ওড়না, ফতুয়া ও পাঞ্জাবি। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস অনলাইন ও অফলাইনে ক্রেতা আকৃষ্ট করছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্রের পোশাক দ্বারা।
পোশাকে পটচিত্র নিয়ে কাজ করছে ‘হরীতকী’। ব্র্যান্ডটির সহপ্রতিষ্ঠাতা অনিক কুণ্ডু বলেন, ‘বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। এই পটচিত্রের বিশেষত্ব হচ্ছে, পটুয়ারা চিত্র আঁকতে আঁকতে গান বাঁধেন। একেকটি শাড়িতে একেকটি পুরাণ কাহিনি তুলে ধরা হয় বলে এটি অনেকের আকর্ষণের কারণ।’
‘আমাদের টপসে তুলে ধরা হচ্ছে একটি পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান। শাড়িতে তুলে ধরা হয়েছে দুর্গাপূজা ও নৌকাযাত্রা। পূজা, দোলযাত্রা, পহেলা বৈশাখসহ যে কোনো উৎসবেই এমন পোশাক পরা যায়। এ ছাড়া পোশাকে রঙের বৈচিত্র্য আছে বলে ক্রেতারা এগুলো খুব পছন্দ করছে। শাড়ি, টপস সিল্ক ফেব্রিকে করায় গরমেও অস্বস্তি বোধ হচ্ছে না। পটচিত্রের পোশাক দামেও সাশ্রয়ী’ বলেন অনিক কুণ্ডু।
পটচিত্রের পাশাপাশি ‘কইন্যা’ যামিনী রায় মোটিফ, আফ্রিকান মোটিফ, জামদানি মোটিফ, টেরাকোটা মোটিফ, টেপা পুতুল মোটিফ নিয়ে কাজ করে।
পটচিত্র পোশাকের যত্ন: রংতুলিতে আঁকা পটচিত্রের পোশাক ঘন ঘন না ধোয়াই ভালো। গরম পানি কিংবা ক্ষতিকর ডিটারজেন্ট পাউডার পটচিত্রের রং নষ্ট করে দেয়। তবে ডিজিটাল প্রিন্টের পটচিত্রের পোশাক সাধারণ নিয়মেই পরিষ্কার করা যায়। শুকানোর সময় কাপড় উল্টিয়ে রোদে দিতে হবে। তবে কাপড় কড়া রোদে শুকানো যাবে না।
- বিষয় :
- নতুন পোশাক
- পোশাকে পটচিত্র