কেমন আছেন, কেমন চলছে দিনকাল?
যদি বলি ভালো, তো খুব স্বার্থপরের মতো শোনাবে; দেশে-বিদেশে নানারকম রাজনৈতিক ও অসুখবিসুখজনিত কারণে লোকে সুখে নাই। তা সত্ত্বেও গতানুগতিক উত্তরে বলব- ভালোই আছি, অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের চেয়ে ভালো আছি। দিন চলছে মূলত লিখে, অনুবাদ করে, এটা-ওটা পড়ে।
আপনার জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে, এমন কোনো ঘটনা বা বিষয়ের কথা জানাবেন কি?
জীবনকে প্রভাবিত করতে পারত অনেক কিছুই। কারণ, আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনই শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু আফসোস, যখন যুদ্ধে যাবার বয়স, সুযোগের অভাবে এবং তার চেয়েও বেশি, পারিপার্শ্বিকতা অগ্রাহ্য করে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমার যুদ্ধে যাওয়া হয়নি। আবার ভেবে দেখি, একদিক থেকে হয়তো ভালোই হয়েছে। কারণ, মাও সে তুঙের লাল বই নিয়ে যুদ্ধে গেলে নির্ঘাত মারা পড়তাম। মানসিকভাবে আমি প্রভাবিত হয়েছি কাজানজাকিসের 'অডিসি' মহাকাব্য এবং 'ক্রাইস্ট রিক্রুসিফাইড' পড়ে। আগে থেকেই একটু ভাবুক প্রকৃতির হওয়ায় বই দুটি আমার ভাবনাচিন্তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি কেমন ছিল?
প্রথম অনুবাদের বই আকুতাগাওয়ার জাপানি গল্পের সংকলন 'রাসোমন' বের করে দ্রাবিড় প্রকাশনী ১৯৮২ সালে। মনে পড়ে বইটা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দু'দিনের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলোচনাও করেছিলাম। তবে আমার প্রথম লেখা সম্ভবত সত্যেন সেনের উপন্যাস 'পাপের সন্তান'-এর একটা সমালোচনা- আহমদ ছফার উৎসাহে করা। এটা ছাপা হয়েছিল ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে কোনো এক দৈনিকের সাহিত্য পাতায়। একই সময় কাজানজাকিসের ওপর একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ ছাপা হয় 'নজরুল একাডেমী পত্রিকায়'। এরপর ১৯৭৪-এর দিকে 'উত্তরাধিকার' পত্রিকায় বের হয় হরহে লুইস বরহেসের একটা সাক্ষাৎকারের অনুবাদ। আমি এবং সম্পাদক কেউই স্প্যানিশ উচ্চারণ না জানায় ছাপা হয়েছিল জর্জ লুই বরজেস নামে।
ব্যক্তিগত জীবনের কোন সীমাবদ্ধতা আপনাকে কষ্ট দেয়?
আউটগোয়িং নই; উচ্চকিত, মুখর, অ্যাগ্রেসিভ নই কোনো ব্যাপারেই। এটাই হয়তো একধরনের সীমাবদ্ধতা।
কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?
জীবনের উদ্দেশ্য সেভাবে কখনও প্রকট ছিল না। আমার যে স্বভাব, তাতে মনে হয় শিক্ষকতাই ছিল আমার জন্য নির্ধারিত পেশা। সেটাই নিয়েছি। সাহিত্যের শিক্ষক না হলে কী হতাম? হয়তো আমলা।
জীবনের এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে জীবনকে কতটা সফল মনে করেন?
সাফল্যের ব্যাপারটা আপেক্ষিক। কেউ কেউ হয়তো মূর্খতাবশে শিক্ষকতাকে করুণা করতে পারেন। কিন্তু এই পেশাতেই যখন আনন্দের সঙ্গে চার দশকের বেশি জড়িত থেকেছি এবং মোটামুটি একটা সম্মানজনক জীবনযাপন করেছি- এতেই আমি সন্তুষ্ট।
নিজের চরিত্রের শক্তিশালী দিক কোনটি?
এটাও আপেক্ষিক। তবে আমি মনে করি, মাঝের পথই সোনালি। চারপাশের নেতিবাচক ব্যাপারগুলো ঘৃণা করে চলতেও একধরনের শক্তি লাগে। যা ভালো লাগে তা করতে পারার আনন্দই আমার মনে হয়। যেমন- জোসেফ ক্যাম্পবেল বলেছেন, আশীর্বাদের পথে চলা।
এখন কী নিয়ে কাজ করছেন?
এখন ফরাসি লেখক রুশোর আত্মজীবনী অনুবাদ করছি। এটা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ফরমায়েশি কাজ। সম্ভবত সম্পূর্ণ বইটার বাংলা অনুবাদ নেই, তাই হাতে নেওয়া।
আপনার প্রিয় বইগুলোর কথা কিছুটা জানতে চাই।
প্রিয় বই তো অনেক- অধিকাংশই ধ্রুপদি গোছের। মনে পড়ে দস্তয়ভস্কির 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট', তলস্তয়ের 'রেসারেকশান', গোগলের 'ওভারকোট', কাজানজাকিসের 'ক্রাইস্ট রিক্রুসিফাইড', 'অডিসি', হেসের 'সিদ্ধার্থ' ইত্যাদি পড়ে কী অভিভূতই না হয়েছিলাম! বাংলা সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্যের অনেক বই-ই আমার প্রিয়, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। তবে এখন বই পড়া হয় কম। লিখি, অনুবাদ করিই বেশি। ঘরভরা বই। কিন্তু আফসোস, এর অধিকাংশই না-পড়া।
ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে আপনার ভাবনাটা কেমন?
এখন আর ভবিষ্যতের ভাবনায় কাজ কী! সময় সমাগত। এর মধ্যে দু-একটি ধ্রুপদি সাহিত্য, বিশেষ করে কাজানজাকিসের 'অডিসি'; যা বাংলায় অনূদিত হয়নি- এমন বই যদি করে যেতে পারি তাই তো মেলা।
সব মিলিয়ে জীবনটাকে কেমন মনে হয়?
সব মিলিয়ে বলব, জীবন সুন্দর। সময় ও মহাশূন্যের যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে আমাদের বাস, বিশেষ করে নাসার পাঠানো লক্ষকোটি আলোকবর্ষ দূরের নীহারিকাপুঞ্জ দেখে জীবনের বিপুল অর্থহীনতার প্রেক্ষাপটে বলতে হয়- কী পাই নি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।

বিষয় : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

মন্তব্য করুন