ইলিনয় থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুরাইয়ার পিএইচডি অর্জন
স্বামী মিজানুর রহমানের সঙ্গে সুরাইয়া আক্তার
সমতা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ০৬:০০
নীলফামারীর মেয়ে সুরাইয়া আক্তারের দু'চোখ আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে। রেটিনার সমস্যায় ভুগলেও একে একে পেরিয়ে যাচ্ছেন সব বাধা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও অসাধ্য সাধন করেছেন সুরাইয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এই অদম্য মেধাবী। তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল 'প্রতিবন্ধিতা ও বাংলাদেশের নারী'। তাঁর স্বামী মিজানুর রহমানও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন সুরাইয়া। এরপর ২০১৭ সালে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে পিএইচডি অর্জন করেন সুরাইয়া। তিনি জানান, পিএইচডি শেষ করার পর তাঁর স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হয়েছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকেও সেখানে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আপাতত ছয় মাস তিনি তাঁর দুই ছেলেকে সময় দেবেন বলে জানিয়েছেন।
তবে তাঁর পিএইচডি অর্জন ধাপগুলো সহজ-সরল ছিল না মোটেই। সুরাইয়া আক্তার রেটিনার সমস্যায় ভুগছেন। চার বোনের মধ্যে তাঁর আরেক বোনও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সুরাইয়া জানান, ঘরে আলো জ্বালানো থাকলে তিনি হয়তো বিছানার চাদরটা দেখতে পান; তবে তাঁর নকশা বুঝতে পারেন না। সামনের সবকিছু ধূসর থেকে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। তিনি এ সত্য মেনে নিয়েই জীবনের সংগ্রামটা শুরু করেছিলেন। প্রতিবারই 'আমি পারব'- এই কথাটি প্রতিষ্ঠিত করে এগোতে হয়েছে তাঁকে। মাধ্যমিকের পর বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির সদস্যরা সুরাইয়ার পরিবারকে বুঝিয়ে পড়ালেখার জন্য তাঁকে ঢাকায় পাঠান। এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গড়ার স্বপ্টম্ন দেখেন সুরাইয়ার স্বামী মিজানুর রহমান। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে গড়ে তোলেন ফিজিক্যালি-চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ) নামের একটি সংগঠন। এ সংগঠনে কাজের মাধ্যমেই সুরাইয়া আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল মিজানুর রহমানের। মিজানুরও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে ২০১২ সালে তিনি সুরাইয়াকে বিয়ে করেন। স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ শেষ করে বিয়ে, তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় প্রথম সন্তানের জন্ম। তারপর পিএইচডি করতে গিয়ে ছোট ছেলের জন্ম।
সুরাইয়া বলেন, 'পিএইচডির আওতায় বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত লেখাগুলো বিশ্নেষণ করেছি। প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে ভবিষ্যতেও কাজ করতে চাই।'
এদিকে স্ত্রী সুরাইয়া আক্তারের পিএইচডি শেষ করার পর স্বীকৃতি প্রদান অনুষ্ঠানের ছবি পোস্ট করে মিজানুর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, বিয়ের প্রথম দিনই স্ত্রীর কাছে তাঁর স্বপ্টেম্নর কথা জানতে চেয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা খুব খুশি হবেন, যদি তিনি বিশ্বের নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করতে পারেন। মিজানুর লিখেছেন, সেই দিনই তিনি তাঁর স্ত্রীর এই স্বপ্টম্ন পূরণে পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। এখন স্ত্রীর স্বপ্টম্ন বাস্তব হয়েছে।
- বিষয় :
- দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী
- পিএইচডি অর্জন