ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধের ক্ষত, নিঃসঙ্গতা ও মানুষ-প্রাণীর গভীর বন্ধন

যুদ্ধের ক্ষত, নিঃসঙ্গতা ও মানুষ-প্রাণীর গভীর বন্ধন
×

ছবি-সংগৃহীত

মীর সামী

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৩৬ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৫৭

বরফে ঢাকা আলাস্কার দুর্গম প্রান্তর; যেখানে রয়েছে তীব্র ঠান্ডা, জনমানবহীন পাহাড় আর বন্যপ্রাণীর ভয়। বিধ্বস্ত একটি উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষের পাশে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে আছেন সাবেক স্পেশাল ফোর্সেস কর্মকর্তা জেমস বেলমন্ট। তাঁর পাশে একমাত্র সঙ্গী–অবসরপ্রাপ্ত যুদ্ধকুকুর ওডিন। লোকালয়ে ফিরতে হলে তাদের পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৫৮ মাইলের দুর্গম পথ। শুরু হয় বেঁচে ফেরার এক অসম লড়াই। এমনই গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ব্র্যাড পিট অভিনীত নতুন সিনেমা ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’। ছবিটি শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে আটকে থাকে না; এর মূলে রয়েছে যুদ্ধের ক্ষত, নিঃসঙ্গতা এবং মানুষ ও প্রাণীর গভীর বন্ধন।

বরফ, ক্ষুধা, বন্যপ্রাণী আর দুর্গম ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি ছবির দুই প্রধান চরিত্রকে মোকাবিলা করতে হয় নিজেদের অতীতের সঙ্গেও। এ সিনেমায় ব্র্যাড পিট অভিনয় করেছেন জেমস বেলমন্ট চরিত্রে। মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক এ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানোর পর অবসর নিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ওডিন নামের একটি কুকুর। এটি কোনো সাধারণ পোষ্য কুকুর নয়। এটি এক যুদ্ধকুকুর। সামরিক প্রশিক্ষিত ওডিন নিজের মতো করে বহন করছে যুদ্ধের স্মৃতি ও ট্রমা। জেমস ও ওডিন একজন মানুষ, অন্যজন প্রাণী। দুজনের অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে দারুণ মিল। দুজনই যুদ্ধ দেখেছে, আঘাত পেয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে।

‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’-এর মূল গল্প শুরু হয় আলাস্কার আকাশে। জেমস তাঁর সিপ্লেন নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বিমানটি বিধ্বস্ত হয় দুর্গম বরফাঞ্চলে। জেমস গুরুতর আহত হন। সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতিও নেই। যোগাযোগের সুযোগ সীমিত, চারপাশে কোনো জনবসতির চিহ্ন নেই। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়–আহত শরীর নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে কোনো এক লোকালয়ের খোঁজে; যার দূরত্ব প্রায় ৫৮ মাইল। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই পথ হয়তো খুব দীর্ঘ নয়। বরফে ঢাকা পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সীমিত খাদ্য ও সরঞ্জাম নিয়ে সেই পথ হয়ে ওঠে মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তের লড়াই। জেমস যত এগিয়ে যান, তত স্পষ্ট হয় তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শুধু শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না। তাঁকে নির্ভর করতে হবে ওডিনের ওপরও।

‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’-এ আলাস্কার পরিবেশ কেবল গল্পের পটভূমি নয়। প্রকৃতি এখানে অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ। তুষার, হিমশীতল বাতাস ও দুর্গম পথ জেমসের যাত্রাকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তোলে। এর সঙ্গে রয়েছে বন্যপ্রাণীর হুমকি। নেকড়ে কিংবা ভালুকের মতো শিকারি প্রাণী যে কোনো সময় তাদের সামনে হাজির হতে পারে। জেমসের জন্য এমন প্রতিটি পরিস্থিতি ভয়ংকর। সেখানে ওডিনের প্রশিক্ষণ এবং প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হয়ে ওঠে বড় শক্তি। কখনও সে আগেভাগে বিপদের আভাস পায়, কখনও জেমসকে সতর্ক করে। আবার কখনও সরাসরি আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে একপর্যায়ে জেমসের কাছে ওডিন আর কেবল সঙ্গী থাকে না; হয়ে ওঠে তাঁর রক্ষক।

ছবিটির সবচেয়ে আবেগঘন জায়গা সম্ভবত এখানেই। জেমস ও ওডিনের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন নেই। ওডিন মানুষের ভাষা বোঝে না, জেমসও তার অনুভূতিগুলো শুনতে পারেন না। বিপদের মুহূর্তে দুজনের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের নীরব বোঝাপড়া। একজনের শারীরিক শক্তি কমে গেলে অন্যজন তাকে এগিয়ে নেয়। একজন বিপদে পড়লে অন্যজন পাশে দাঁড়ায়। বরফের মধ্যে দীর্ঘ যাত্রা যত এগোয়, তাদের সম্পর্কও তত গভীর হয়।

কিছুদিন আগে প্রকাশ হয়েছে সিনেমাটির দুটি ট্রেলার। যেখানে দুই ধরনের আবহ দেখা গেছে। প্রথম ট্রেলারে গুরুত্ব পেয়েছে বিমান দুর্ঘটনা, আলাস্কার ভয়ংকর প্রকৃতি এবং বেঁচে থাকার লড়াই। বরফে আটকা পড়ার পর জেমস ও ওডিন কীভাবে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়, তার বেশ কিছু আভাস সেখানে রয়েছে। দ্বিতীয় ট্রেলারে এসেছে সম্পর্কের দিকটি। জেমস ও ওডিনের পারস্পরিক নির্ভরতা এবং একে অন্যকে হারানোর ভয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ট্রেলারের ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা ‘স্ট্যান্ড বাই মি’ গানের কভার সংস্করণ আবেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সেখানে ওডিনের বীরত্বও তুলে ধরা হয়েছে। নেকড়ের আক্রমণসহ বিভিন্ন বিপদে জেমসকে রক্ষা করতে দেখা যায়। ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’ সিনেমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ব্র্যাড পিট ও পরিচালক ডেভিড আয়ারের পুনর্মিলন। এর আগে তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘ফিউরি’তে। ‘ফিউরি’র মতো এখানে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নেই। তবে যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে প্রধান চরিত্রের মনে। ফলে আয়ারের সামরিক ও যুদ্ধভিত্তিক গল্প বলার অভিজ্ঞতা ছবিটির চরিত্র নির্মাণ ও অ্যাকশন দৃশ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ছবির অ্যাকশন তাই শুধু উত্তেজনা তৈরির জন্য নয়। প্রতিটি সংঘাত জেমস ও ওডিনের যাত্রাকে আরও বিপজ্জনক করে। বরফের মধ্যে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সামান্য অসতর্কতাও তাদের জন্য শেষ বিপদ ডেকে আনতে পারে।

প্রথম দেখায় ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’ একজন আহত মানুষের দুর্গম প্রান্তর থেকে ফিরে আসার গল্প। এর ভেতরে রয়েছে আরও এক যাত্রা। জেমসকে শুধু বরফ পেরোতে হবে না; তাঁকে নিজের অতীতের মুখোমুখিও হতে হবে। যুদ্ধের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা, একাকিত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন করে কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস রাখা। এগুলোও গল্পের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমাধান নয়, একজন সঙ্গী। ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’ সিনেমায় ওডিন সেই সঙ্গীর প্রতীক।

এই চরিত্রে অভিনয় করেছে জার্মান শেফার্ড ‘উবার’। পিটের কাছে উবার শুধু সহশিল্পী ছিল না; শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছিল তাদের সম্পর্ক। পিট বলেছেন, পুরো সিনেমায় তিনি ও উবার অনেকটা তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্য তৈরি করেছেন। উবার যেদিকে যেতে চাইত, অনেক সময় দৃশ্যও সেদিকে এগিয়ে নেওয়া হতো।

পিটের ভাষায়, সিনেমাটিতে জেমস ও ওডিন কীভাবে একে অপরের ওপর নির্ভর করে এবং একসঙ্গে কাজ করে, সেটি গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি। তিনি মজা করে উবারকে সিনেমার ‘আসল তারকা’ এবং কল শিটের ‘নাম্বার ওয়ান’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওডিন। উবারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাকে পিট বলেছেন অপ্রত্যাশিতভাবে বিশেষ এক অভিজ্ঞতা। সিনেমার দৃশ্যধারণ চলাকালে উবার তাঁর খুব কাছের হয়ে উঠেছিল বলেও জানান তিনি।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পিট সিনেমাটিকে সরাসরি একটি প্রেমের গল্প হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছে ছবিটির মূল বিষয় কেবল দুর্গম প্রকৃতিতে টিকে থাকা নয়; বরং মানুষ অন্য মানুষের কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য কী করতে পারে, সেই সম্পর্কও এর কেন্দ্রে রয়েছে; যা কোনো অংশে প্রেমের চেয়ে কম নয়।

বর্তমানে পিটের বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে। তাঁর পরবর্তী আলোচিত সিনেমা ‘দ্য ফারদার মিস-অ্যাডভেঞ্চার্স অব ক্লিফ বুথ’। কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর চিত্রনাট্যে ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত ছবিতে পিট আবারও ফিরছেন ‘ওয়ানস আপন আ টাইম ইন হলিউড’ সিনেমার অস্কারজয়ী চরিত্র ক্লিফ বুথ হয়ে। এবারের গল্পের সময়কাল ১৯৭৭ সাল। বদলে যাওয়া হলিউডে নানা কাজ করতে করতে ক্লিফ জড়িয়ে পড়ে অন্ধকার এক জগতে। ছবিটি আগামী ২৫ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাবে।

আরও পড়ুন

×