মিরপুরে দখল
মধ্যরাতে টিকাদান কেন্দ্রে হামলা, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ভবন
বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালানো হয়। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৩১ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৩১
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মুখোশ পরা ২৫০ জনের বেশি দুর্বৃত্ত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে হামলা চালিয়ে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। পরে তারা ক্লিনিকের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ফ্রিজ, এসি, নগদ টাকাসহ বিভিন্ন মালপত্র লুট করে এবং স্থাপনা ভেঙে ফেলে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুক্রবার সকালে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার এসব তথ্য জানান।
ডা. নাসরিন আখতার বলেন, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। এটি এলাকার হাজারো নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে প্রায় ২৫০ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’-এর ব্যানারে ক্লিনিকে হামলা চালায়। তারা সেখানে কর্তব্যরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। একপর্যায়ে ক্লিনিকটি দখলে নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বাধা দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট, দুটি টিভি, দুটি কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টারসহ চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র নিয়ে যায়।
পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিঃ’-এর সাইনবোর্ড লাগানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, লুটপাট ও ভাঙচুরে যন্ত্রপাতি ও মালপত্রের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ঘটনায় ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আগামীকাল থেকে ক্লিনিকটিতে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই প্রতিষ্ঠানটি দখল ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ডা. নাসরিন আখতার। তিনি বলেন, হামলাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়, দেশের দরিদ্র, শিশু ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপরও আঘাত।

প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে দুটি দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো, হামলায় জড়িত সবাইকে দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের সম্পূর্ণ ক্ষতি পূরণ করে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা।
ঘটনার বিষয়ে ডিএমপির শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, রাড্ডা নামের একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে উৎসুক জনতাকে জড়ো হয়ে থাকতে দেখেছেন। ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের বিবৃতি
এদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার এক বিবৃতিতে এটিকে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্রেখ করে লুটপাটে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে যা ঘটেছে, তা নিছক কোনো ডাকাতি বা হামলা নয়-এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যা সমাজের অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি জঘন্য ষড়যন্ত্র। এই হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়; এটি এই দেশের প্রতিটি গরিব মা, প্রতিটি শিশু এবং প্রতিটি অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।’
দেশের সচেতন নাগরিক, মানবাধিকার সংগঠন, চিকিৎসক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিবৃতিতে বলেন, ‘এই হামলা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং সমাজের সেই সব মানুষের বিরুদ্ধে যারা প্রতিদিন এই সেবার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। আজ যদি আমরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করি, যদি এই হামলার বিরুদ্ধে নীরব থাকি, তবে আগামীকাল সেই সন্ত্রাসীরা আরও দুঃসাহসী হয়ে উঠবে এবং সারা দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র তাদের জন্য অরক্ষিত হয়ে পড়বে। তখন এই নীরবতা আমাদের নিজেদেরই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে।’