জ্বালানি তৈলের মূল্যবৃদ্ধি
অসময়োচিত, অসংবেদনশীল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকল প্রকার জ্বালানি তৈলের মূল্য এক লম্ফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি সংকটে জর্জরিত জনগণের প্রতি সরকারের সংবেদনহীনতার প্রকাশ বলিয়া আমরা মনে করি। রবিবার জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য স্থিত হইয়াছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। নিঃসন্দেহে জনজীবনে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তৈলের এই সর্বোচ্চ মূল্যের প্রভাব হইবে কার্যত সর্বগ্রাসী। সকল প্রকার যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু যাতায়াত ব্যয়ই বড় পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে না; পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাইবে। বিশেষত সেচ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া কৃষিতেও উহার প্রভাব হইবে সুদূরপ্রসারী। এমনিতেই ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাসহ কতিপয় কারণে পণ্য বিক্রয় করিয়া বহুদিন যাবৎ কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও উঠে না। এখন সংকট আরও তীব্র হইবে। সর্বোপরি, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনও ইহার ফলে দুরূহ হইবে।
সরকার এমন সময়ে জ্বালানি তৈলের বর্ধিত মূল্য নির্ধারণ করিয়াছে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় নানা কারণে বহুগুণ হইবার ফলস্বরূপ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবন ইতোমধ্যে দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে। উপরন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকটে জনজীবনে ত্রাহি মধুসূদন রব উঠিয়াছে। বলা বাহুল্য, বিশেষত দুই বৎসরের অধিক সময় যাবৎ প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমানে বিএনপি সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকোচনের ধারা চলিয়াছে, যাহার অভিঘাতে একদিকে নিম্নআয়ের মানুষদের বৃহদাংশ রুটি-রুজির সংস্থানে ব্যর্থ হইতেছে, অন্যদিকে বহু মধ্যবিত্ত পরিবারও আয় সংকোচনের শিকার হইয়াছে।
বিস্ময়কর হইল, জনজীবনে উহার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবগত থাকিয়াও সরকার পূর্বসূরিদের ন্যায় পদক্ষেপটির পক্ষে খোঁড়া যুক্তি দিয়া চলিয়াছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দাবি, লোকসানের কারণে জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হইয়াছে। অন্যদিকে সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করিয়াছেন, তৈলের মূল্য বৃদ্ধির পরও সরকারকে প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি দিতে হইবে। অথচ সংস্থাটির নিজের পরিবেশিত তথ্যই বলিতেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবৎসরে সকল খরচ ও কর বাদ দিয়া বিপিসি প্রায় সাড়ে চার সহস্র কোটি টাকা প্রকৃত মুনাফা করিয়াছে। গত ১১ বৎসরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অধিক মূল্যে তৈল বিক্রয় করিয়া সংস্থাটির মোট মুনাফা দাঁড়াইয়াছে প্রায় ৫২ সহস্র কোটি টাকা। তদুপরি, উক্ত সময়ে সংস্থাটি কর-শুল্ক ও ঋণ পরিশোধ বাবদ সরকারি কোষাগারে সোয়া লক্ষ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে জমা দিয়াছে। ইহাও উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার পাঁচ মাসে তিনবার জ্বালানি তৈলের মূল্য বৃদ্ধি করিল; যদিও ক্ষমতা গ্রহণকালে অন্তত দুই বৎসর গ্যাস-তৈল-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি না করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল।
বিশেষজ্ঞগণের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিপিসি যতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে, তাহা অত্যাবশ্যকীয় এই পণ্যের উপর সরকার আরোপিত প্রায় ৩২ শতাংশ কর-শুল্কের একাংশ হ্রাস করিলেই পূরণ করা যাইত। অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প কর্তন, তৎসহিত প্রশাসনের বিবিধ অনিয়ম-অপচয় বন্ধের মাধ্যমেও আলোচ্য খাতে দেয় ভর্তুকির অর্থ সংগৃহীত হইতে পারে।
সর্বোপরি, জ্বালানির ন্যায় কৌশলগত পণ্যে ভর্তুকিকে জাতীয় বিনিয়োগরূপে দেখিলেও সমস্যাটির সমাধান সম্ভব। আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং জনজীবনের সংকটের কথা ভাবিয়া সরকার অবিলম্বে জ্বালানি তৈলের বর্ধিত মূল্য পুনর্বিবেচনা করিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়