মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা
জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪২
রাজধানীর মিরপুরের এক টিকাদান কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যেই তাণ্ডব চালানো হইয়াছে, তাহা শুধু ন্যক্কারজনক নহে, নজিরবিহীনও বটে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়া শনিবার প্রকাশিত সমকাল জানাইয়াছে, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার নামক উক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মুখোশ পরিহিত আড়াই শতাধিক দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র লইয়া হামলা চালায় এবং ক্লিনিকের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ঔষধ, ভ্যাকসিন, ফ্রিজ, এসি, নগদ টাকাসহ মালপত্র লুট করে। এমনকি হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ সম্পূর্ণ স্থাপনা গুঁড়াইয়া দেয় এবং সেখানে ‘সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিঃ’-এর সাইনবোর্ড সংযুক্ত করে। সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখলের ঘটনা এই দেশে নূতন নহে। তবে এক রাত্রির মধ্যে সম্পূর্ণ স্থাপনা ধুলায় মিশাইয়া দেওয়ার ঘটনা অতীতে কখনও দেখা যায় নাই।
উল্লেখ্য, সরকারের সহিত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রায় অর্ধশত বৎসর যাবৎ এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়া আসিতেছে। তাই ইহা গরিবের হাসপাতালরূপে খ্যাত। কিন্তু এহেন কোনো কিছুই দুর্বৃত্তদের মন গলাইতে পারে নাই। নেপথ্যের ভূমিদস্যুদের ভূমিলোলুপতা চরিতার্থ করিতে তাহারা সেখানে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দাবি, মূলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হইয়াছে। অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত এহেন দখলবাজির ঘটনা ঘটে না। আলোচ্য ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দিকে আঙুল উঠিয়াছে। এলাকার বাসিন্দাদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাইয়াছে, উক্ত হামলাকারীরা যদ্রূপ বিএনপির কর্মকাণ্ডের সহিত সংশ্লিষ্ট, তদ্রূপ উহাদের ইন্ধনদাতারা হইলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা।
বস্তুত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই এই দলের নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ দেশের প্রায় সর্বত্র বিশেষত চাঁদাবাজি ও দখলের মহোৎসবে মাতিয়া উঠিয়াছে বলিয়া অজস্র অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে আসিতে থাকে। বিশেষত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলে ইহার বিরূপ প্রভাব পড়িতে পারে– এমন আশঙ্কায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তখন ঐ সকল অপকর্মের সহিত জড়িতদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু উহা কার্যকর কোনো ফল দিয়াছে– এমন দাবি করা যায় না। তদুপরি সরকার গঠনের পর বিশেষত সরকারের তরফ হইতে কোনো আইনগত পদক্ষেপ না থাকায় দলটির নেতাকর্মীদের একটা অংশ যেন কয়েক গুণ উৎসাহ লইয়া চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চালাইয়া যাইতে থাকে। মিরপুরের ঘটনা উহারই ধারাবাহিকতা বলিলে নিশ্চয় ভুল হইবে না। ইহাও উল্লেখ্য, সম্পত্তি দখল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া ইতোমধ্যে রাজধানীর পল্লবী, বাড্ডাসহ দেশের বহু স্থানে বিএনপি ও উহার অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যকার সংঘাত-সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি ঘটিলেও এহেন ভয়ংকর পরিস্থিতি বিরাজমান।
অধিকতর দুর্ভাগ্যজনক, আলোচ্য ঘটনাসহ ইতোপূর্বে সংঘটিত প্রতিটা অপরাধমূলক ঘটনায় বিশেষত যেগুলিতে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য বা সমর্থকরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন, পুলিশ প্রায় নীরব দর্শকের ভূমিকা অবলম্বন করিয়াছে। ফলে ভুক্তভোগীদের অসহায়ত্ব কয়েক গুণে স্থিত। সত্য, পুলিশ বাহিনী ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পূর্বাপর সময়ের ধাক্কা অদ্যাবধি সম্পূর্ণ সামলাইয়া উঠিতে পারে নাই। ইহাও সত্য, সরকারের দিক হইতে পরিষ্কার বার্তা না থাকিলে কোনো বাহিনীর পক্ষেই দায়িত্ব পালন সম্ভবপর নহে। আমাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্য বিরূপ জনপ্রতিক্রিয়া পরিহার করিতে হইলেও মিরপুরের টিকাদান কেন্দ্রের ঘটনায় সরকারকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ লইতে হইবে। শুধু ক্ষুদ্র পুঁটি নহে; ইহার নেপথ্যের ইন্ধনদাতা হিসাবে যাহাদের নাম আসিয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। অস্বীকার করা যাইবে না, এহেন পদক্ষেপ আগামী দিনে দখলদারিত্ব বা যে কোনো অপকর্মে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অন্যদেরও সংশ্লিষ্ট হইতে নিরুৎসাহিত করিবে।