ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমার ছবি আঁকার উষাকাল

আমার ছবি আঁকার উষাকাল
×

সাম্প্রতিক একটি চিত্রকর্মের সামনে হাশেম খান

হাশেম খান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলায় আমি যখন ছবি আঁকা শুরু করি, তখন আঁকার কোনো নিয়মকানুন বা প্রথাগত ব্যাকরণ জানা ছিল না। বাবা একদিন মানচিত্র এঁকে তাতে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগ দেখানোর জন্য বললেন। জিপসি কোম্পানির ওয়াটার কালারের বক্স ছিল। আমাদের তুলি ছিল ভাঙা। তাই আমি আর আমার বড় ভাই কাঠি বা শলার মাথায় তুলা পেঁচিয়ে তুলি বানিয়ে নিতাম। তারপর পানিতে রং ভিজিয়ে কাগজে ঘষে ছবি আঁকতাম। মানচিত্রও সেভাবেই রং করা হয়েছিল। পরে অবশ্য আমার ছবি আঁকার এমন ঝোঁক দেখে বড় ভাই বললেন, “আচ্ছা, পুরো বাক্সটা তোরে দিয়ে দিলাম।”
আমার বড় ভাইও খুব সুন্দর ছবি আঁকতেন। তাঁর আঁকা দেখেই মূলত আমার ভেতরে অনুপ্রেরণা আসে এবং আমিও আঁকতে শুরু করি। আমরা কখনও খাতায়, আবার কখনও বইয়ের পাতায় আঁকাআঁকি করতাম। এখনকার মতো তখন শিশু-চিত্রকলা বা চিত্রকলা নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা বা সুযোগ-সুবিধা ছিলই না। চাঁদপুরে একজন পঙ্গু লোককে দেখতাম, ঘরে গান শুনতেন আর দরজা-জানালা বন্ধ করে নিজে নিজে ছবি আঁকতেন, কাউকেই দেখাতেন না।
চাঁদপুরে আমাদের একমাত্র পরিচিত শিল্পী ছিলেন সাধন বাবু। তিনি ছিলেন চাঁদপুরের ফুটবল খেলার নামকরা গোলকিপার, আবার পাশাপাশি সাইনবোর্ডের দোকান চালাতেন। তিনি খুব সুন্দর গল্প করতে পারতেন। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। সাধন বাবু যে দোকানে বসে সাইনবোর্ড লিখতেন, আমরা সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। তিনি আমাদের চা খাওয়াতেন, বেশ আনন্দ হতো। সাধন বাবু আমাদের বলতেন, “বোস, দেখ কেমনে রং গোলায়।” কীভাবে সাইনবোর্ড তৈরি করতে হয়, আমি মনোযোগ দিয়ে তা দেখতাম। সাধন বাবু অবশ্য কাজের চেয়ে তাঁর ফুটবল খেলার গল্পই বেশি করতেন।
চাঁদপুরে তখন কোনো সিনেমা হলের জন্য আলাদা সিনেমার ব্যানার আঁকা হতো না; সেসব ঢাকা থেকেই তৈরি হয়ে যেত। সাধন বাবু মূলত সাইনবোর্ডই লিখতেন এবং টিনের পাত্রে বা রিকশার পেছনে যেমন ছবি আঁকা হয় নিজের মতো তেমন কিছু ছবি আঁকতেন। নতুন যারা বিয়ে করত, তারা সাধন বাবুকে দিয়ে টিনের ট্রাঙ্কের ওপর বার্নিশ কালার দিয়ে সুন্দর সুন্দর ডিজাইন করিয়ে নিত। তখনকার দিনে তো আর প্লাস্টিক কালার ছিল না, বার্নিশ কালার দিয়েই সাইনবোর্ডের কাজ আর ডিজাইন করা হতো।
চারুকলায় ভর্তি ও শুরুর দিনগুলো
১৯৫৬ সালে আমি চারুকলায় ভর্তি হই। তখন কিন্তু শাহবাগের এই মূল ভবনটি তৈরি হয়নি। ইনস্টিটিউটটি তখন ছিল সেগুনবাগিচার ২৮ নম্বর একটি ভাড়া বাড়িতে– বর্তমান শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার ঠিক পাশের জায়গায়। সেখানে একটি দোতলা বাড়ি, কিছু টিন ও টালির ঘর। সামনে সুন্দর একটি লন।
অবশ্য চারুকলার একদম প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার নবাবপুরের ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের দুটো রুমে। সরকার থেকে ওই ঘর দুটি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তিন-চার বছর চলার পর ছাত্রসংখ্যা বাড়লে এটি সেগুনবাগিচার ভাড়া বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। আমরা সেগুনবাগিচায় ১৯৫৬ সালে ভর্তি হয়ে প্রায় ছয় মাস ক্লাস করেছিলাম। এরপর ১৯৫৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে শাহবাগের এই নতুন ভবনে চলে আসি।
আমাদের প্রথম শিক্ষক ছিলেন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। তিনি কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করে এসেছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন খুব লাজুক, শান্ত প্রকৃতির। তাঁর মন ছিল মমতায় পূর্ণ। তিনি আমাদের খুব আদর করতেন। তবে মূল ভবনে আসার তিন মাসের মাথায় তিনি জাপানের একটি স্কলারশিপ পেয়ে দেশের বাইরে চলে যান। এরপর আমাদের ক্লাস টিচার হয়ে এলেন শিল্পী আব্দুল বাসিত। ওটাই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষকতা।
এক বছর পর আব্দুল বাসিতও আমেরিকার একটি স্কলারশিপ পেয়ে চলে যান। তখন আমাদের পূর্বসূরি ছাত্র শিল্পী রশীদ চৌধুরী স্পেন থেকে পড়ালেখা শেষ করে ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের ক্লাসের দায়িত্ব নেন।

রশীদ চৌধুরী আমাদের খুব পরিশ্রম করাতেন। তিনি আমাদের পাখি ও অন্যান্য পশুপাখির ওপর স্টাডি করাতেন। আর প্রথম বর্ষে আমরা ঘরের বাইরে গিয়ে স্কেচ করতাম, নিসর্গ আঁকতাম, পেন্সিলসহ নানা মাধ্যমে ড্রয়িং শিখতাম।
ব্ল্যাকবোর্ড ড্রয়িং
আমাদের সময় ‘ব্ল্যাকবোর্ড ড্রয়িং’ নামের একটি বিষয় ছিল। ব্ল্যাকবোর্ডে অজন্তা ও ইলোরার ছোট ছোট ড্রয়িং লাইনে আঁকতে হতো। যখন আমি চারুকলার শিক্ষক, তখন এই ক্লাসটা বন্ধ করা হয়। আমি খুব প্রতিবাদ করেছিলাম যেন ব্ল্যাকবোর্ড ড্রয়িংটা ফার্স্ট ইয়ার ও সেকেন্ড ইয়ারে কমপ্লিটলি থাকে। তার কারণ, এর পরেই ছাত্ররা পেইন্টিং ক্লাসে যাবে, তখন পুরো হাত বা বাহু নাড়াতে হবে। জয়নুল আবেদিন এজন্য এটা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। কাগজে যখন আঁকা হয়, তখন শুধু হাতের কবজি বা আঙুল নড়ে। কিন্তু আমাদের তো পরে বড় বড় ছবি আঁকতে হয়। তাই প্রথম বর্ষেই নন্দলাল বসুর ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট করা অপ্সরীর ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং ব্ল্যাকবোর্ডে অনেক বড় করে তা আঁকতে হতো। এতে পুরো বাহু নড়ত, ফলে প্রথম থেকেই সাহস বাড়ত এবং বড় ক্যানভাস হাতে চলে আসত। কিন্তু এখন তা উঠিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে এটার কোনো দরকার নেই। আমি শিক্ষক হিসেবে একা অনেক নিয়মের প্রতিবাদ করেছি। ইউনিভার্সিটিতে চারুকলাকে অনুষদ করার বিষয়টিও আমি প্রতিবাদ জানিয়ে চার বছর আটকে রেখেছিলাম। কারণ ইন্টারমিডিয়েট কোর্সের সমমানের দুই বছরের প্রিলিমিনারি বা এলিমেন্টারি কোর্স শেষে ডিগ্রি ও অনার্সে ভর্তি নেওয়া হতো। চারুকলা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতায় একটি আলাদা ইনস্টিটিউট হিসেবে পরিচালিত হতো। কিন্তু শিক্ষকরা দেখলেন অনুষদ হলে সব ডিপার্টমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাবে এবং চেয়ারম্যানরা ভাতা ও পরীক্ষা বাবদ ভাতা পাবেন। আগে ম্যাট্রিক পাস করার পর যার আগ্রহ থাকত, তাকে পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করানো হতো। এখন অনুষদে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আসতে হয়, কিন্তু এতে যে অনেক ভালো মানের শিল্পী তৈরি হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। আগের নিয়মে প্রথম দুই বছর শেখার ফলে ছাত্ররা অনেক স্কিল্ড আর্টিস্ট হয়ে উঠত।
পারিবারিক পেছনপট, সংগ্রাম
আমি অবশ্য আর দশটা সাধারণ ছাত্রের মতো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ফ্রেমে বাঁধা ছিলাম না, নিয়মকানুনের বাইরে গিয়েও অনেক কাজ করতাম। কারণ আমার মাথায় ছিল পারিবারিক দায়িত্ব ও টানাপোড়েন।
আমরা ছিলাম সাত ভাই ও সাত বোন– মোট ১৪ ভাইবোন! আমাদের বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বাবা ছিলেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। মা গ্রামে লোকজন দিয়ে চাষবাস করাতেন, সেটাই ছিল আমাদের পরিবারের মূল জীবিকা। আমাদের ভাইবোনদের স্কুল-কলেজের বেতন দিতে দিতে বাবার পুরো বেতন শেষ হয়ে যেত।
ঢাকায় চারুকলায় ভর্তি হওয়ার পর যখন দেখলাম এখানে প্রচুর পড়াশোনার খরচ, তখন নিজের মনেই ভয় কাজ করত। এসব খরচের কথা বাবাকে জানালে হয়তো তিনি বলতেন, “চাঁদপুর বাসার কাছের কলেজে ভর্তি হয়ে যা।” তা ছাড়া তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় চারুকলা সম্পর্কে মানুষের কোনো ভালো ধারণা ছিল না। সবাই বলত, “চারুকলায় পড়ে কী করবে? বেকার থাকবে।” তখনকার সিনেমায় উত্তম কুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো নায়কদের দেখা যেত ছবি এঁকে কোনো চাকরি-বাকরি পাচ্ছে না, যক্ষ্মায় ভুগছে, ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমন কিছু পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে নিজেকেই সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করে নিতে হয়েছিল। 

আরও পড়ুন

×