অন্ধ জেলিফিশ
অলংকরণ:: সাফায়েত সাগর
মাহরীন ফেরদৌস
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
এই গল্পের শুরু অনেক বছর আগে। আমার অজস্র ধূসর অতীত আর বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে আজও যদি সেই রাতটির দিকে তাকাই, মনে হয়, সেদিন থেকেই আমি যেন কোনো ঘন গহন বনের ভেতর দিয়ে অন্য এক বাস্তবতার স্রোতে ভেসে গিয়েছিলাম।
তখন আমি বেশ ছোট। একবার আমি আর আমার এক খালাতো বোন অর্চি নানুবাড়িতে প্রবল ঝড়বৃষ্টির রাতে লুকোচুরি খেলছিলাম। অর্চি প্রতিবারই কোথাও না কোথাও লুকিয়ে পড়ছিল, আর আমি তাকে খুঁজে খুঁজে বের করছিলাম।
“জেলিফিশ জেলিফিশ, হোয়াট ডু ইউ সি?”
বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে লুকিয়ে থেকে বলছিল ও।
“আই সি অর্চি লুকিং অ্যাট মি।”
এই উত্তর দিয়েই আমি ওকে ধরতে ছুটে যাচ্ছিলাম। এভাবেই খেলা চলছিল আমাদের।
এমন সময় প্রচণ্ড শব্দে কোথাও বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক হয়ে গেল অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। বন্ধ ঘরের ভেতর বাতাসের কোনো নড়াচড়া নেই। অথচ কাচের ওপারে দেখলাম, সমস্ত গাছপালাকে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি এসে উন্মত্তের মতো ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে। বিদ্যুতের ঝলকে দৃশ্যটা একেকবার স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। গাছগুলো নড়ছে, ডালপালাগুলো ছুটে যাচ্ছে, আর পরের মুহূর্তেই সবকিছু আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
আমি সেই উন্মত্ত ঝাঁকুনি বারবার দেখছিলাম বিদ্যুতের আলোয়। তারপর তেমনই আরেকটি ঝলকে দেখতে পেলাম অদ্ভুত এক দৃশ্য। অর্চি আমার ভীষণ কাছে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে স্থির। যেন এতক্ষণ ধরে সেখানেই ছিল। ওর মুখ ভীত ও বেদনার্ত। সেই মুখে ভয় আর বেদনা এমনভাবে মিশে ছিল যে, মুহূর্তের জন্য ওকে আমার একেবারে অচেনা মনে হলো।
বুকের ভেতর একই সঙ্গে জমে উঠছিল দ্বিধা আর অস্বস্তি। ঘর থেকে ছুটে পালাতে চেয়েও পারছিলাম না। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। আর অদ্ভুত এক শিশুসুলভ বিশ্বাসে শুধু চাইছিলাম, আমাদের খুঁজতে যেন কোনো বড় মানুষ সেই ঘরটায় এসে পড়ে। তবে কেউ আসেনি।
বাইরে তখনও বাতাস আর বৃষ্টির শব্দ। ঘরের ভেতর এমন অন্ধকার, যেন পৃথিবীর কোনো আলো সেখানে কোনোদিন আসতে পারবে না। হঠাৎ মনে হলো, আমার ঠিক সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে ভাবলাম, অর্চি। কিন্তু পরক্ষণেই কেন যেন মনে হলো, এটা অর্চি নয়। আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। শরীরের ভেতর কোথাও যেন একটা ঠান্ডা অনুভূতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি নড়তে পারছিলাম না।
তখন অন্ধকারের ভেতর থেকে খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসে একটা শব্দ ভেসে এল। মনে হলো, কেউ এখনই আমার নাম ধরে ডাকবে। ভয়ে আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম। কতক্ষণ কেটে গেল জানি না। মনে হলো, যেন অনন্তকাল।
এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে এল।
আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু আলো আমাকে স্বস্তি দিল না। বরং আরও বেশি ভয় পাইয়ে দিল। কারণ আমি আগে যে ঘরে ছিলাম, এবার সেই ঘরে আর ছিলাম না। আমি আবিষ্কার করলাম, আমি লুকিয়ে আছি আমার মা আর খালার ঘরের পাশের একটা ছোট্ট, জানালাবিহীন ঘরটির চৌকির নিচে। গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়রা মাঝেমধ্যে চিকিৎসার কাজ কিংবা ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকায় এলে এই ঘরটাতেই থাকত।
প্রথমে কিছুক্ষণ আমি বুঝতেই পারছিলাম না, কীভাবে এখানে এলাম। চারপাশে তাকালাম। না, ভুল দেখছি না। আমি আর অর্চি যে ঘরে লুকিয়েছিলাম, সেটি এই ঘর নয়।
কিন্তু আমি এখানে এলাম কীভাবে? আমার চোখে যেন ধাঁধা লেগে গেল। চৌকির নিচে অর্চিকে খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু কোথাও তাকে পেলাম না।
আমাদের নানুবাড়িটা এমনিতেই ছিল এক ধরনের গোলকধাঁধা। একাত্তরের পর নানা যাত্রাবাড়ীর ভেতরের দিকে বিশাল একটুকরো জমি কিনে ধীরে ধীরে জোড়াতালি দিয়ে বাড়িটা বানিয়েছিলেন। সদরের দরজা পেরিয়ে বসার ঘর, তারপর একের পর এক সরু প্যাসেজ, ঘর, সিঁড়ি আর বাঁক। একদিকে ছিল সেই ছোট্ট জানালাবিহীন ঘর, আর তার পরেই কোণের ঘর, যেখানে সেদিন আমি আর অর্চি লুকিয়েছিলাম।
ছোটবেলায় বাড়িটার এইসব ঘর, প্যাসেজ আর বাঁক আমার কাছে সত্যিই একটা গোলকধাঁধার মতো মনে হতো। বিশেষ করে রাতের বেলা। মনে হতো, একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘরে যাওয়ার পথে বাড়িটা হয়তো নিজের অজান্তেই মেরি-গো-রাউন্ডের মতো ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিন যা ঘটেছিল, তাকে শুধু বাড়ির গোলকধাঁধা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ আমি জানতাম, আমি কোথায় ছিলাম। আমি জানতাম, অর্চি কোথায় ছিল। তারপরও আলো জ্বলার পর আমি এমন একটা জায়গায় বসে ছিলাম, যেখানে আমার থাকার কথা ছিল না।
সেই রাতে আমার আর ঘুম হয়নি। ছোট মামার সঙ্গে প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে শুয়েও বাকি রাতটা জেগে কাটিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকে সেই কোণের ঘর থেকে ডাকছে। কখনও খুব কাছে, কখনও অনেক দূর থেকে। কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি।
সেই রাতের কথা পরে বেশ কয়েকবার অর্চিকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু ও কেমন যেন হেঁয়ালিপূর্ণ অদ্ভুত সব উত্তর ছাড়া আর কিছুই বলত না। “রবিন, তুই কি জানিস, ২৫৯টা পিঁপড়া খেলে তুই জীবনেও পানিতে ডুবে মরবি না?”
অথবা,
“ডান হাতের সঙ্গে বাঁ হাত বাঁকা করে পেঁচিয়ে রেখে এক পায়ে যদি টানা ঊনত্রিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে পারিস, তাহলে তুই অনেক বড়লোক হতে পারবি।” এমন সব কথা বলত ও। আমি প্রশ্ন করতাম, আর ও যেন ইচ্ছে করেই প্রশ্নের বাইরে কোথাও চলে যেত।
সেই ঘটনার কয়েকদিন পর আরেক রাতে আবার বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। আমরা নানুবাড়ির উঠানে পাটি বিছিয়ে বসে আছি। আকাশ তখন পরিষ্কার, অজস্র নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। একদিকে মামারা অন্যদিকে আম্মা আর খালা মিলে একের পর এক সিনেমার নাম বলে তুবড়ি ছোটাচ্ছেন। আমি আর অর্চি তখন একই পাটিতে বসে নাম-দেশ-ফুল-ফল খেলছিলাম।
এমন সময় আবার আমার ভেতর কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হলো। মনে হলো, এই বুঝি কেউ বসার ঘরের বড় দরজা দিয়ে প্রবল বেগে দৌড়ে এসে শিকারি কুকুরের মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। বুক ধকধক করতে লাগল। প্রায় দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকলাম। কিন্তু কিছুই হলো না।
বরং অর্চি কেমন যেন চাপা স্বরে আমার নাম ধরে ডাকতে থাকল।
“রবিন।”
আমি তাকালাম না।
আবার ডাকল।
“রবিন, শোন।”
আমি তখন ভয়ে ভেতরে ভেতরে কাঁপছি, অথচ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। অর্চি আর কিছু বলল না। শুধু শক্ত করে আমার হাত ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেল। এরপর থেকে আমার মনে হতে লাগল, প্রথম রাতের ঘটনাটা হয়তো শুধু আমার একার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু পরের রাতের ঘটনায় অর্চিও যেন কিছু জানত। অথবা এমন কিছু দেখেছিল, যা আমাকে বলতে চায়নি।
এর কিছুদিন পরই আব্বা আমাকে আর আম্মাকে নিয়ে কানাডায় চলে গেলেন। নিজের দেশ, আত্মীয়স্বজন, নানুবাড়ি, সেই বাড়িসহ সব পেছনে ফেলে আমরা দূর প্রবাসে নতুন জীবন শুরু করলাম।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই দুই রাতের স্মৃতিটা আমার মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে একেবারে নিখুঁত ছবির মতো গেঁথে রইল। এত বছর পরও এর কোনো অংশ মুছে যায়নি। আম্মা যখন বেঁচে ছিলেন, মাঝেমধ্যে তাঁকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, নানুবাড়িতে কেউ কখনও অদ্ভুত কিছু দেখেছে বা শুনেছে কিনা। আম্মা প্রতিবারই আমার প্রশ্নগুলো এমনভাবে উড়িয়ে দিতেন, যেন আমি শৈশবের কোনো আজগুবি গল্প নিয়ে বসেছি।
তারপর অনেক বছর কেটে গেল। আব্বা স্ট্রোক করে মারা গেলেন। পড়ালেখা শেষ করে ততদিনে আমি ইলোনাকে বিয়ে করেছি। সে স্কটিশ বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান। ইলোনার প্রতি আমার তীব্র কোনো প্রেম ছিল না, কিন্তু আমাদের মধ্যে ভালো একটা বোঝাপড়া ছিল। একসঙ্গে থাকার একটা স্বচ্ছন্দতা ছিল, এমনকি বিছানাতেও। হয়তো সেই স্বচ্ছন্দতাই আমাদের সম্পর্কটাকে এতদিন টিকিয়ে রেখেছিল।
ইলোনা যখন প্রায় ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, একদিন তার অবস্টেট্রিক অ্যাপয়েন্টমেন্টে গিয়েছিলাম। সেখানেই হঠাৎ এক ভারতীয় নার্সকে দেখে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
অর্চি।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এ তো অর্চি।
অবশ্যই সে অর্চি ছিল না। চেহারায় হয়তো পুরোপুরি মিলও ছিল না। কিন্তু মানুষের স্মৃতি যুক্তি মেনে কাজ করে না। একটা চোখের দৃষ্টি, মাথা ঘোরানোর ভঙ্গি, কখনও শুধু একটা মুখের অস্পষ্ট ছায়াই বহু বছর চাপা পড়ে থাকা কোনো দরজা খুলে দিতে পারে।
সেদিন অর্চির কথা খুব মনে পড়ল। কেমন আছে ও? কোথায় আছে? কী করে আছে? দেশের বেশির ভাগ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই তখন আমার আর যোগাযোগ নেই। অর্চির সঙ্গেও নেই।
হঠাৎ মনে হলো, এতগুলো বছর ধরে আমি কি আসলে ওর কথাই ভুলে ছিলাম, নাকি শুধু ভুলে থাকার ভান করেছি? আমি কি ছোটবেলায় ওকে পছন্দ করতাম? নাকি সেই রাতের পর থেকেই অর্চির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোনো অসমাপ্ত অনুভূতিকে আমি স্মৃতি বলে ভুল করে এসেছি?
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি খুব একটা থাকতাম না। তবু কৌতূহল থেকে ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে অর্চির নাম খুঁজলাম। কিছুই পেলাম না। জানি, এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। সবাই সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকে না। কেউ নাম বদলে রাখে, কেউ অন্য নামে অ্যাকাউন্ট চালায়।
তবু সেদিন প্রথমবার আমার মনে হলো, অর্চির সঙ্গে আমার শৈশবের যে গল্পটা আমি এতদিন ধরে নিজের বলে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি, সেই গল্পের কিছু অংশ হয়তো আমি জানিই না।
হাসপাতালের সেই মেয়েটাকে দেখার পর থেকে অদ্ভুতভাবে প্রায় প্রতিরাতেই শৈশবের সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়তে লাগল। কখনও মনে হতো, আমি আবার চৌকির নিচে শুয়ে আছি। কখনও বিদ্যুতের ঝলকে অর্চির চোখ দুটো আবার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর কখনও গভীর রাতের নীরবতায় মনে হতো, খুব দূর থেকে কেউ আমাকে দেখছে আর মনে মনে ডাকছে। কণ্ঠটা এত পরিচিত, অথচ এত দূরের যে, বুঝতে পারতাম না, সেটা আমার স্মৃতি থেকে আসছে, নাকি সত্যিই কেউ আমাকে ডাকছে।
ধীরে ধীরে নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে উঠলাম। ঘুম কমে গেল। অফিসের কাজের চাপও বাড়ছিল। অকারণে খিটখিটে হয়ে উঠছিলাম, ইলোনার সঙ্গে বিশ্রী ব্যবহার করতে শুরু করলাম। আমাদের মানসিক সংযোগ এমনিতেই খুব গভীর ছিল না। তার ওপর শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও কমে আসায় নিজেকে আরও বিচ্ছিন্ন আর বিরক্ত লাগতে থাকল। ইলোনা যে আমারই সন্তান ধারণ করছে, এই সত্যিটা নিয়েও আমার ভেতরে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এর সঙ্গে আমার জীবনে আরও একটা পারিবারিক দায়িত্ব যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই ভাবনাটাই আমাকে অস্থির করে তুলছিল।
মাসখানেক পর একদিন ইলোনা রাগ করে তার মায়ের বাসায় চলে গেল। আমি জানতাম, এখনই আমার উচিত ওকে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমার কোনো ইচ্ছাই জাগল না। ও চলে যাওয়ার পর কিং-সাইজের বিছানায় একা গড়াগড়ি করতে করতে বুঝলাম, আমার অবচেতন মন যেন এই বিচ্ছেদে বেশ নির্ভার। ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার অর্চির মুখ মনে পড়ল।
তারপর হঠাৎ মনে হলো, ইলোনাকে কিছুদিন ওর মায়ের বাসায় থাকতে দিই। আমি বাংলাদেশে ফিরে যাই। অর্চির মুখোমুখি হই। ঘুরে আসি নানুবাড়ির সেই জায়গাটায়।
হয়তো সেখানে এখন আর সেই বাড়িটা নেই। হয়তো জায়গাটার ওপর বহুতল ফ্ল্যাট উঠে গেছে। হয়তো রাস্তাগুলোও বদলে গেছে। তবু কেন যেন মনে হচ্ছিল, আমাকে সেখানে যেতেই হবে। মনে হচ্ছিল, কেউ আমাকে ডাকছে। কিংবা জীবনের এই পর্যায়ে এসে প্রথমবারের মতো আমি নিজেই নিজের অতীতের দিকে ফিরে যাচ্ছি।
ইলোনাকে কোনোক্রমে বুঝিয়ে পরের সপ্তাহেই ঢাকায় এলাম। দীর্ঘ আঠারো বছর পর। এই আঠারো বছরে ঢাকা বদলে গেছে, যাত্রাবাড়ীকেও প্রায় চেনা যায় না। রাস্তা, দোকানপাট, বাড়িঘর, মানুষের ভিড়, সবকিছুর মধ্যে এমন এক অচেনা তাড়াহুড়ো, যেন শহরটা আমার অনুপস্থিতিতে নিজের আরেকটা জীবন তৈরি করে ফেলেছে। একটা হোটেলে সপ্তাহখানেকের জন্য রুম নিলাম। তারপর বুঝলাম, আমি আসলে বাংলাদেশে ফিরিনি। আমি ফিরে এসেছি নিজের অতীতের কাছে, কিংবা হয়তো অর্চির বর্তমানের কাছে।
পরের দিন বিকেলে নানুবাড়িটা খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় লাগল না। আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে চারপাশের বহুতল ভবনগুলোর মাঝে বাড়িটা এখনও জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং বিবর্ণ, কোথাও প্লাস্টার খসে পড়েছে। মনে হলো, চারপাশের সবকিছু বদলে গেলেও বাড়িটা যেন নিজের জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে পারেনি।
বাড়ির সামনে বেতের মোড়ায় বসে ঝিমাচ্ছিল লম্বা দাড়ির এক বয়স্ক লোক। হাতভরা তার নানা পাথরের আংটি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, বাসাটায় এখন বুড়ো লোকটা আর দুইজন ভাড়াটিয়া থাকে। মালিকানা এখনও আমার তিন মামার নামে। খালা বা খালুর ব্যাপারে সে কিছু বলতে পারল না। অর্থাৎ অর্চির কথা জানার তো প্রশ্নই আসে না।
হতাশ লাগল। বুঝলাম, এখানে থেকে কোনো লাভ নেই। চলে আসার আগে হঠাৎ বাড়িটার ভেতরটা একবার দেখতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, দরজায় পা দিয়েই চমকে গেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার মনে থাকা বাড়িটার সঙ্গে এই বাড়ির বিন্যাসের কোনো মিল নেই।
আমি বললাম, “এখানে না একটা বড় ঘর ছিল, চাচা? তারপর একটা প্যাসেজ। তারপরেই একটা ছোট্ট জানালাছাড়া ঘর। একটা চৌকি থাকত সেখানে।”
বুড়ো আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি এমন কোনো জায়গার কথা বলছি, যার অস্তিত্বই কোনোদিন ছিল না। তারপর অল্প কাশতে কাশতে বলল,
“কই ছিল? কী কইতাছেন এইসব?”
আমি আর কিছু বললাম না। কারণ আমার স্মৃতিটা তখনও অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার। নানা-নানুর ঘর, তিন মামার ঘর, মা আর খালার ঘর, জানালাবিহীন ছোট ঘর, তার পরের কোণের ঘর, বড় আলমারি, অর্চি। এত বছর পরেও আমি চাইলে চোখ বন্ধ করে পুরো পথটা বলে দিতে পারি। অথচ বাড়িটা যেন আমার সেই স্মৃতিকে অস্বীকার করছে।
আমার ভেতর প্রচণ্ড হতাশা আর বিরক্তি জমতে থাকল। না, এখান থেকে চলে যেতে হবে। এখনই। আমি ঘুরে দাঁড়াতেই বুড়ো পেছন থেকে ডাকল।
“আপনার নামটা যেন কী কইলেন?”
“রবিন। রবিন আহমেদ।”
আমার নামটা শুনে লোকটার মুখের ভাব বদলে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাড়িটার ভেতরের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় কিছু একটা বলতে লাগল। শব্দগুলো পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম না। শুধু শেষের দিকে শুনলাম,
“ভবিতব্যানাং... দ্বারাণি... ভবন্তি... সর্বত্র...” তারপর হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এতদিন পরে আবার আইলেন ক্যান?”
আমি থমকে গেলাম। “আবার?”
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ, আবার।”
আমার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আগেরবার তো আপনি একা আসেন নাই।”
আমি আর কথা বলতে পারলাম না। বুড়ো বাড়িটার ভেতরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
“আপনার সঙ্গে একটা মাইয়া আছিল।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। এত বছর ধরে যেটাকে আমি নিজের একার স্মৃতি বলে ধরে রেখেছিলাম, হঠাৎ মনে হলো, সেই স্মৃতির আরেকজন সাক্ষী আছে।
আমি খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী যা-তা বলছেন আপনি?”
লোকটা এবার আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো কৌতূহল ছিল না, যেন সে এমন কোনো সত্যের কথা বলছে, যেটা আমার জানা থাকার কথা। ঠিক তখনই বাড়িটার ভেতরটুকু ও আমার চারপাশ অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে গেল। কোথাও কোনো শব্দ নেই। থমথমে স্থির সবকিছু।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। তারপর কী মনে করে পায়ে পায়ে বাড়ির ডান পাশের প্রথম ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট একটা ঘর, স্টোরেজের মতো। পুরোনো কিছু ফার্নিচার আর দফায় দফায় চটের বস্তা মেঝেতে পড়ে আছে। জানালার পর্দা মলিন। আর তেমন কিছু নেই। হঠাৎ জানালার পাশের দেয়ালে চোখ আটকে গেল। সেখানে ফ্রেমবন্দি একটা পুরোনো ছবি। আমি আর অর্চি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি। আমার একটা হাত আছে অর্চির উঁচু হয়ে থাকা পেটের ওপর।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার শরীরের ভেতর কোথাও যেন কিছু থেমে গেল। ছবিটা শুধু অর্চির সঙ্গে আমার পুরোনো কোনো ছবি ছিল না। মাসখানেক আগে কানাডায় ইলোনার সঙ্গে যে ছবিটা তুলেছিলাম, তার সঙ্গে এর অদ্ভুত মিল। এতটাই মিল যে, এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, আমি যেন একই ছবির দুই সময়ের দিকে তাকিয়ে আছি। শুধু মানুষ দুটো বদলে গেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে বুড়োর কফজড়ানো কাশি আবার শোনা গেল। শব্দটায় কোনো পাত্তা দিলাম না। দেয়ালের ছবিটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। জমে গিয়েছিলাম, বিমূঢ় হয়ে। ঠিক তখনই আমার পেছন থেকে কেউ একজন খুব আস্তে বলে উঠল,
“চিতা স্পর্শ করে পাতা
তাঁর গরহাজিরার
দীপ্তি দিয়ে,/ডালপালার মধ্য দিয়ে
দৌড়ে যায় বেড়াল,/এক ডুবন্ত আগুন;
যার ভেতর জ্বলে আছে/এক অরণ্যের চোখ...”
- বিষয় :
- গল্প