পিকেএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
প্রান্তিক মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সাড়ে তিন দশকের সঙ্গী
পিকেএসএফের লোগো
মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন শেখ
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৩ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৪
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের উঠে দাঁড়ানোর সংগ্রামে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পূর্ণ দেশীয় ধারণার ওপর ভিত্তি করে যাত্রা শুরুর পর একটি প্রতিষ্ঠান এত অল্প সময়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার নজির খুব বেশি নেই। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গঠন তার ভবিষ্যৎ পথচলার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের জন্য সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে কোন দিকে অগ্রসর হবে, ব্যবস্থাপনিক এবং কার্যক্রম বাস্তবায়নের কৌশলগত পদ্ধতি কী হবে এবং শেষ পর্যন্ত সমাজে কী ধরনের প্রভাব রাখবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের যাত্রারম্ভের প্রাথমিক গঠনের ওপর। নব্বইয়ের দশকে পিকেএসএফ গঠনে বিশ্বব্যাংকের সুস্পষ্ট সম্পৃক্ততা থাকলেও এর গঠন প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের অযাচিত প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। সম্ভবত তারই সুফল আজকের বাংলাদেশে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিকেএসএফের ইতিবাচক ভাবমূর্তি।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার ভূমিকা এবং প্রভাব ছিল অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কনসোর্টিয়াম বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমগুলো গ্রহণ করা হতো। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে নানা আর্থিক এবং অ-আর্থিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনিক নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ছিল। এ ধরনের একটি বাস্তবতায় সরকারের সরাসরি প্রভাবের বাইরে থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান প্রণয়ন, কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ, অর্থায়ন, অর্থের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে শুধু যে সরকারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছিল তাই নয়, বরং দাতা সংস্থার সরাসরি প্রভাব থেকেও মুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছিল এই ফাউন্ডেশনকে। পিকেএসএফের প্রাথমিক পথচলায় সম্পৃক্ত সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চ ধী-শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি অগাধ দেশপ্রেমের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল।
প্রাথমিক পর্যায়ে আত্মকর্মসংস্থান এবং মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করে পিকেএসএফ। পরে আর্থিক পরিষেবার পাশাপাশি নানা রকমের কারিগরি সহায়তা প্রদান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়েও পিকেএসএফ তার সম্প্রসারিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অবদান রাখতে শুরু করে।
ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে ওস্তাদ-শাগরেদ সম্পর্কের মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিরই একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। মোটর ড্রাইভিং, মেকানিক্স, হস্তশিল্প, রেস্তোরাঁ এ জাতীয় শিল্পগুলোতে নবনিযুক্ত বেশির ভাগ শ্রমিক শাগরেদ হিসেবে অভিজ্ঞ ওস্তাদদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কাজ শিখে নেয়। বাংলাদেশে পেশাদার গাড়িচালকদের প্রায় শতভাগ বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তার ওস্তাদের কাছ থেকেই ড্রাইভিংয়ের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক আরও বহু পেশার ক্ষেত্রেও ওস্তাদের কাছ থেকে শাগরেদ হিসেবে দীক্ষা নিয়ে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার এবং পরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিজেই ওস্তাদ বনে যাওয়ার শতসহস্র উদাহরণ আমাদের সমাজে রয়েছে। সমাজের এই প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিকেই পিকেএসএফ সম্প্রতি ব্যবহার করেছে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পে।
সম্প্রতি অরবিস ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষের চক্ষু চিকিৎসাসেবা দান এবং ১ লাখ ছানি অপারেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে পিকেএসএফ, যা প্রতিষ্ঠানটির বিগত সাড়ে তিন দশকের বহু মানবিক কর্মকাণ্ডের একটি উদাহরণ মাত্র। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কারিগরি সেবা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদিত পণ্যের বিপণন সহায়তা প্রদান এবং পিকেএসএফ কর্তৃক আর্থিক পরিষেবা প্রদানের অনিবার্য অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের উপকূলীয় এবং খরাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পিকেএসএফ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য উন্নত ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পানি সরবরাহ এবং নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে দেশের ৩০টি জেলার ১৮২টি উপজেলায় একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১২ হাজার তরুণকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ৩০% নারীদের জন্য সংরক্ষিত। দেশের অতিদরিদ্র মানুষেরা তাদের অবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে যেন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, তার জন্য পিকেএসএফের বিশেষ কর্মসূচি রয়েছে। আবাসন, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, অতিদরিদ্র, পরিবেশ ও জলবায়ু, লাইভস্টক, ঝুঁকি নিরসন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও বয়স্কদের জন্য পিকেএসএফের রয়েছে পৃথক কার্যক্রম।
সম্প্রতি পিকেএসএফ পাঁচ বছরের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি, আয় ও সম্পদ ক্ষয়রোধ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও সহযোগী সংস্থাসহ নিজেদের সার্বিক সামর্থ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পিকেএসএফ মাঠপর্যায়ে সব কর্মসূচি বা কার্যক্রম সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছে। অর্থাৎ পিকেএসএফ কোনো কার্যক্রমই সরাসরি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে না। কার্যক্রম বাস্তবায়নে এই সৃজনশীল পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে বিগত সাড়ে তিন দশকে প্রায় ২০০টি সহযোগী সংস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, নীতিকাঠামো এবং সর্বোপরি মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে থাকে পিকেএসএফ। পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থার মধ্যে বেশ কয়েকটি সংস্থা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও দারুণভাবে পরিচিত ও সুখ্যাতি অর্জন করেছে। এভাবে, বহু উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে পিকেএসএফ।
পিকেএসএফের প্রায় সাড়ে তিন দশকের পথচলায়, সাফল্যের প্রতিটি স্তরে যারা অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন এবং করছেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভক্ষণে তাদের সবার প্রতি শুভেচ্ছা।
মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন শেখ: সহকারী মহাব্যবস্থাপক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)
minhaztmp@gmail.com
- বিষয় :
- উন্নয়ন
- দারিদ্র্য নিরসন