সমকালীন প্রসঙ্গ
জননিরাপত্তার দুরাশায় অরক্ষিত শিশু-কিশোর
অপ্রতিম হত্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মসূচি
মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩৪
সাত মাস হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছি। এত এত জনসমস্যার মাঝে হয়তো নতুন বাংলাদেশ দেখার জনপ্রত্যাশাটা হারিয়ে গেছে। আমরা ভালো থাকতাম যদি নতুন সরকার স্বল্প সময়ে দেশের প্রধান জনচাহিদা পূরণে বদ্ধপরিকর হতো। এখন যে সমাজে বাস করছি তথায় নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রকাশিত বিশ্ব শান্তি সূচক সেই চিত্র প্রকাশ করে। শূন্য থেকে পাঁচ স্কেলে কম মানে ভালো নির্দেশিত সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা উপসূচকে এ বছর ২.৫৭৯ স্কোর নিয়ে আমরা বিশ্বের ১১৫তম স্থানে রয়েছি। সমাজের একজন বাসিন্দা হিসেবেও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে সর্বাগ্রে জনচাহিদা জানা যায়। সাধারণ মানুষ খাদ্য-অর্থ নয়, সরকারের কাছে চায় জীবনের নিরাপত্তা। কারণটা হয়তো এটাই যে, মানুষ নিজ পরিশ্রমে ব্যবস্থাটা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সরকার সমাজের প্রধান চাহিদা অনুধাবন করছেন তো?
গেল সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে, যার মধ্যে দুই হাজারের বেশি এখনও নিখোঁজ রয়ে গেছে। অন্য সূত্রমতে, এ বছর এই পর্যন্ত ৩৬ জন নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। যদিও অনেকের মৃত্যুসংবাদ গণমাধ্যমে আসেনি। তাদের প্রতি সহানুভূতি যতটা থাকুক, কারও যেন করার কিছু নেই। যে মা-বাবার সন্তান চলে গেছে, সে-ই বুঝছে তার হারানোর বেদনা কী। তেমনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সহকর্মী ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাইরে গিয়েছিল। ছেলে বাসায় না ফেরায় অসহায় মা রাতে ফেসবুকে এক পোস্টে সবার সহায়তা চান। সারারাত ধরে তন্নতন্ন করে খোঁজার পর না পেয়ে বেদনাভরা হৃদয়ে তিনি লেখেন– ‘আমার ছেলেরে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে। ও কি বেঁচে আছে?’ তারপর আমাদের সেই ছেলের নিথর দেহ নির্জন জঙ্গলেই পাওয়া গেল!
অপ্রতিম নিখোঁজের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী ও প্রশাসন সবাই সোচ্চার ছিল। পুলিশসহ এসেছে সবাই, নিয়েছে আশু ব্যবস্থা সবিশেষ। অপ্রতিমের লাশ পাওয়ার পর মাকে সান্ত্বনা জানাতে ছুটে এসেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। গভীর শোক প্রকাশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। কুমিল্লা পুলিশও এক দিনের মধ্যে সম্ভাব্য সব আসামি ধরে ফেলেছে। এত আয়োজনে কী হলো, মায়ের কাছে কী রইল? অকল্পনীয় এই হত্যাকাণ্ডের কারণ জানালেন পুলিশ সুপার। আইফোন ছিনিয়ে নিতেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জড়িতরা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। আজ অসম বন্ধু চক্রের ফাঁদে পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেল আমাদের খোকা অপ্রতিম। কাল হয়তো শুনতে হবে অন্য আরও নির্মমতার কাহিনি! বলতে কি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে পর্যটন এলাকাতে ছিনতাই ও মাদকের কথা প্রায়ই শুনি। অঘটন ঘটার পর পুলিশের তৎপরতার ফল কী দিল। কুমিল্লা শহরের কিশোর গ্যাং-সহ নানা অপরাধের ওপর নাম ধরে ধরে জাতীয় পত্রিকাগুলো রিপোর্ট করেছে। সেগুলো দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা কী করেছে?
অতীত ও নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাকাণ্ড, পৈশাচিক ধর্ষণ ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা নাড়া দেওয়ার মতো। সমাজ যে এ ভার বহন করতে পারছে না, তা বুঝতে সরকারের কত কাল লাগবে। সময়ান্তে শিশু-কিশোরের ওপর চলমান নির্মমতা ও বর্বরতার মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে। তারা যেন অপরাধীদের সহজ টোপ হয়ে গেছে। এদিকে কিশোররা নিজেরাই তো জড়িত হচ্ছে অপরাধ চক্রে। ইতোমধ্যে বহু গণমাধ্যম কিশোর গ্যাং নামের প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও লালনে রাজনৈতিক নেতার সমর্থনের খবর দিয়েছে। তাদের সহিংসতা, ধর্ষণ কিংবা মাদকাসক্তির পেছনে কারণ যেটাই থাকুক না কেন, অপরাধ দমনের দায় তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরই বর্তায়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি-সামর্থ্য কেন বাড়ছে না? বিদ্যমান খারাপ পরিস্থিতি আরও কত অবনতি হলে আমরা পুলিশকে উজ্জীবিত দেখব?
শুধু পেশাদার অপরাধীরা নয়, সাধারণ মানুষও গুরুতর অপরাধ করতে পরোয়া করছে না। তার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ ও গাণিতিক সূত্র আছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের তত্ত্বমতে, কোনো ব্যক্তি যখন দেখে অপরাধের প্রত্যাশিত ব্যয়ের চেয়ে তার প্রাপ্ত উপযোগ বেশি, তখন সে অপরাধের লাভ খুঁজে পায়। সমাজে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখতে দেখতে অনেকের মধ্যে শাস্তি পাওয়ার ভয় কেটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়! তার সঙ্গে আছে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক বছর আগে থেকেই তো মানুষ খুনের হেঁয়ালি খেলায় মেতেছে! আর ৫ আগস্টের পর পুলিশের কার্যক্রম দুর্বল হওয়ার কারণে ধরা পড়ার ভয়ও যেন কেটে গেছে। তাই কি সমাজে ক্রমশ অপরাধীর সরবরাহ ও অপরাধ ব্যবসার ব্যাপ্তি বাড়ছে?
এদিকে দুর্বল বন্ধনের সমাজে অপরিচিতজনের মধ্যে দেওয়া-নেওয়ার মাঝে সবাই যেন বেশি নিতে চায়। এমন নেতিবাচক পারস্পরিকতার শহুরে সমাজে কেন যেন ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ও ঠকবাজ মানুষগুলো বুদ্ধিমান বনে গেছে। বখাটে ও নিষ্ঠুর মানুষগুলো ছিনতাই করছে এবং মেরে পর্যন্ত ফেলছে। এরই মধ্যে দৃঢ় বন্ধনের গ্রামীণ সমাজও দুর্বল ও খণ্ডিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের প্রথমভাগে টাঙ্গাইল জেলায় এমন রূপান্তর খুঁজে পান জাপানি অধ্যাপক কোইচি ফুজিতা। সর্বোপরি জার্মান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বার্টেলসম্যান স্টিফটুং কর্তৃক প্রণীত সামাজিক সংহতি সূচকের ঋণাত্মক মান আমাদের দুর্বল ও খণ্ডিত সমাজকে নির্দেশ করছে। পারস্পরিক সংহতি কমায় কারও স্বজন হারানোর বেদনাও যেন অন্যকে আবেগিত করে না। ঘরেবাইরে শিশুদের ওপর নির্মমতা ও বর্বরতার পেছনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। খেলার মাঠে কিংবা সহপাঠীর সঙ্গে কোথাও তারা নিরাপদ নয়। সমাজের বন্ধন কঠোর কিংবা দুর্বল হোক, কার দায়ে শিশু-কিশোররা বিনাদোষে গৃহবন্দি রবে?
আইনশৃঙ্খলার উন্নতির উপায় নিয়ে কথা বলতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানুষের নৈতিক অবক্ষয় থামানোর কথা এনেছেন। পচে যাওয়া মানুষগুলো হয়তো সংশোধন হবে, আর সমাজে একদিন সুরক্ষা ফিরবে! এমনিতেই সাধারণ মানুষও যেন ক্রমে বেশি অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। অপ্রতিমের মৃত্যুসংবাদের পরপরই খাবার খেয়ে ফেলার জন্য বেধড়ক পিটুনিতে খুলনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হত্যার খবর এসেছিল। অপ্রতিমকে হত্যার পর খুনিরা খেয়েদেয়ে নিজ নিজ ঘরে ঘুমিয়েছে। তুচ্ছ কারণে উগ্রতা থেকে হত্যার পর অনেকে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছে। নির্দয় অপরাধের পরও খুনি নির্ভয় থাকার কারণ কী হতে পারে? কিশোররা হয়তো মব ভায়োলেন্সকে দেখেছে মব জাস্টিস রূপে। তাহলে যুবক-বৃদ্ধের আচরণও কেন একই? প্রথাগত বিশ্লেষণে যে কারণ উঠে আসে না, অপ্রথাগত বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে তা খুঁজে পায়। কেমব্রিজ অধ্যাপক স্টিভেন লেভিট অদ্ভুত গবেষণার মাধ্যমে ফ্রিয়েকোনমিকস ধারণার প্রচার করেছেন। তিনি নব্বই দশকের আমেরিকার কিশোর গ্যাং আতঙ্ক নিজে নিজে কমে যাওয়ার কারণ পেয়েছেন গর্ভপাতের পক্ষে আদালতের রায়। যদি ধরি এ দেশে মানুষের মনে কেন নির্দয়তা, উগ্রতা ও নির্ভয়তা ডুকছে? অপ্রথাগত বিশ্লেষণে কারণটা হয়তো হাইব্রিড খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ! তবে মূল প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে অস্থির অপরাধ থামাতে আইন প্রয়োগে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত দৃঢ়চেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়েও কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্তপোক্ত করে কাজে লাগাতে পারবেন না? জননিরাপত্তা নিশ্চিতে জনগণ সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চায়।
ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
akanda@cou.ac.bd
- বিষয় :
- অপ্রতিম
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
- শিশু হত্যা