উপাচার্য অপসারণে চুয়েটে ছাত্রদলের ‘রাজনীতি’
চুয়েটে সদ্য বিদায়ী উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে গতকাল শনিবার সকালে বিক্ষোভ চলাকালে নতুন উপাচার্যের উদ্দেশে ‘লাল কার্ড’ দেখান শিক্ষার্থীরা - সমকাল
চুয়েট সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর উদ্দেশে লাল কার্ড দেখিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল থেকে নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। একই দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতিও চলছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় অপসারণের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদল নেতাদের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপাচার্য অপসারণের কারণ হিসেবে তাঁর আওয়ামী রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন ছাত্রদলের নেতারা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে অধ্যাপক সায়েমকে আকস্মিক অপসারণের বিষয়ে বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।
অভিযোগে জানা যায়, অধ্যাপক আবু সাদাত সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই তাঁকে অপসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান কিছু ছাত্রদল নেতা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে তদবির করে আসছিলেন। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নবনিযুক্ত উপাচার্য চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছালেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির মধ্যে তিনি ওই দিন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে যাননি। তবে আন্দোলনকে ঘিরে ছাত্রদল এবং সাবেক নেতাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা নবনিযুক্ত উপাচার্যকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং অপসারিত উপাচার্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন।
চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ দাবি করেন, চলমান আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও শিবির-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ইন্ধন রয়েছে। শিক্ষকদের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষক সমিতির ব্যানারে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্যরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন দাবি করেন, চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতারা শুরু থেকেই অধ্যাপক সায়েমের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তাঁর ভাষ্য, সায়েমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে দেওয়া হয়েছিল এবং সরকারের তদন্তের পরই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম সমকালকে বলেন, আমি জীবনে কোনো রাজনীতি করিনি; কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। এর বাইরে আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই।
নতুন উপাচার্যকে লাল কার্ড
গতকাল দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারসংলগ্ন সড়ক থেকে ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শনের মাধ্যমে মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিলে যোগ দেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে লাল কার্ড দেখা যায়। মিছিল থেকে ‘অনলাইন ভিসি মানি না’, ‘রেড কার্ড টু অনলাইন ভিসি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান বলেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম ৫৬ দিনে শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে চুয়েটকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছেন। নতুন উপাচার্য তাদের আন্দোলনকে ৩০-৩৫ জনের আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ প্রতিটি হল থেকে শত শত শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর এই বক্তব্য ও অনলাইনে যোগদানকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন।
নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসতে পারেন– এমন খবরে শুক্রবার রাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। রাতভর সেখানে অবস্থান করে ক্যাম্পাসে প্রবেশকারী যানবাহন ও ব্যক্তিদের বিষয়ে নজর রাখেন তারা। শনিবার সকালেও প্রধান ফটকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান অব্যাহত ছিল।
সকালে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও একাডেমিক ভবনের দেয়ালে প্রতিবাদী ও ব্যঙ্গাত্মক গ্রাফিতি আঁকেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া এসব গ্রাফিতিতে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অধ্যাপক আবু সাদাতকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরা হয়।
যেভাবে তীব্র হলো আন্দোলন
চুয়েটের উপাচার্য সায়েমকে অপসারণ করে নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর পর থেকেই ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রথম দিকে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আজ রোববার থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। একই দাবিতে কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স ও কর্মচারী সমিতিও। শিক্ষার্থীদের শাটডাউন, প্রধান ফটকে অবস্থান এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা
শুক্রবার রাতেই নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের কার্যালয় ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এর পর থেকেই নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আগমনের খবরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শনিবার সকালেও শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। ফলে নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে যোগদান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।
কেন অধ্যাপক সায়েমকেই চান শিক্ষার্থীরা
উপাচার্য পদে অধ্যাপক সায়েমের দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যের শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাব, সরাসরি যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ, একাডেমিক ও পেশাগত সুযোগ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা, স্কলারশিপ ও শিক্ষার্থী বিনিময় পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ পূর্ণতা পাওয়ার আগেই উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে। তাই ৫৬ দিনের কর্মকাণ্ডের চেয়ে ওই সময়ে তৈরি হওয়া আস্থা, প্রশাসন-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তারা অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহাল চান।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন করছেন না; বরং তাদের দাবি, উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে চলমান কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর সম্মিলিত অবস্থানের প্রতিফলন। এ বিষয়ে তারা আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
যা বললেন নতুন উপাচার্য
উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম সমকালকে বলেন, আমি বর্তমানে সার্কিট হাউস থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি হয় এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে, সে জন্য আমি শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারা আমাকে সহযোগিতা করছেন।
কখন ক্যাম্পাসে আসবেন– এ ব্যাপারে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। যদি সবার সঙ্গে আপস হয়ে যায়, তাহলে আজ-কালের মধ্যে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারি।
- বিষয় :
- চুয়েট